দেশের ১৫ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই
গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে প্রায় ১৫ সহস্রাধিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কোনো খেলার মাঠ নেই। ঢাকা শহরের অর্ধেকেরও অধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৭২ শতাংশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থীরা এই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
খেলার মাঠ শিশুর বিকাশের প্রধান সূতিকাগার
খেলার মাঠ কেবল ধুলাবালির চত্বর নয়, বরং এটি শিশুর শরীর ও মনের সুষম বিকাশের প্রধান সূতিকাগার। ইসলাম ধর্মেও শারীরিক সুস্থতা ও চিত্তবিনোদনের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এক হাদিসে বলা হয়েছে, একজন শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের অপেক্ষা অধিক উত্তম ও আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। মূলত শরীরকে সচল ও সবল রাখার অন্যতম মাধ্যম হলো ক্রীড়া ও দৌড়ঝাঁপ।
মনীষীদের বক্তব্য ও ডিজিটাল আসক্তি
দার্শনিক জন লক বলেন, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন' (A sound mind in a sound body)। আর এই সুস্থ দেহের জন্য চাই মুক্ত বাতাস ও খেলার মাঠ। জিন জ্যাক রুশো তার ‘ইমিল' গ্রন্থে শিশুর প্রাকৃতিক পরিবেশে মুক্তভাবে বেড়ে ওঠার ও খেলার ছলে শিক্ষালাভের প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। মাঠের অভাবে শিশুরা আজ গৃহকোণে বন্দি হয়ে ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হচ্ছে। বিশেষত শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের এই সংকট অধিকতর প্রকট।
আইসিডিডিআর,বির গবেষণা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণা মতে, ঢাকা শহরের স্কুলপড়ুয়া শিশুরা দৈনিক গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় কাটায় মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দায় চোখ রেখে, যার ফলে তাদের ঘুম কমে যাচ্ছে, ওজন বাড়ছে এবং নানাবিধ মানসিক জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।
নীতিমালা ও বাস্তবতার ফারাক
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও নির্দেশনা রয়েছে; কিন্তু তা সত্ত্বেও, অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অতি ক্ষুদ্র পরিসরে, গ্যারেজে কিংবা আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠেছে। যেসব বিদ্যালয়ে মাঠ রয়েছে, সেখানেও বিকালবেলা মাঠগুলো তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। আবার রাজধানীর আসাদ গেটের লালমাটিয়া নিউ কলোনি মাঠের মতো বহু মাঠ আজ অবৈধ দখল, কাঁচাবাজার ও আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
ঢাকায় প্রয়োজন ৬১০টি মাঠ, আছে মাত্র ২৩৫টি
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) এক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে যেখানে অন্তত ৬১০টি মাঠ প্রয়োজন, সেখানে বাস্তবে আছে মাত্র ২৩৫টি।
সংকট থেকে পরিত্রাণের উপায়
এই সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রথমত, খেলার মাঠ ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর গড়ে তুলতে দেওয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, সরকারি নীতিমালা কেবল কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে, মাঠবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নতুন বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাপের খেলার মাঠের অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রতিটি এলাকায় বেদখল হয়ে যাওয়া খেলার মাঠ ও পার্কগুলোকে অবিলম্বে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে শিশুদের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, যেসব মাঠে তালা লাগিয়ে রাখা হয়, বিদ্যালয় ছুটির পর আশপাশের শিশুদের জন্য সেগুলো উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দিতে হবে।
ইমাম গাজ্জালির বাণী ও সময়ের দাবি
পরিশেষে, মনীষী ইমাম গাজ্জালির (রহ.) সেই অমূল্য বাণী স্মরণ করতে হবে–‘লেখাপড়ার পর শিশুকে খেলার অনুমতি দেওয়া উচিত, যাতে তার অবসাদ দূর হয়। খেলাধুলা বন্ধ করিলে শিশুর বুদ্ধি স্থবির হয়ে যায়।' অতএব, আমাদের শিশুদের সুন্দর ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ উপহার দিতে তাদের খেলার মাঠের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া আজ সময়ের দাবি।



