শিশু শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন বাবা আমাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসছিলেন। হেঁটে হেঁটে ফেরার পথে বাবা কারও সঙ্গে কথা বলতে দাঁড়িয়ে আমার হাত ছেড়ে দেন। আমি বাবা ভেবে আরেকজনের হাত ধরে হাঁটা শুরু করি। কিছুক্ষণ পর বাবা দৌড়ে এসে আমাকে টেনে ধরেন এবং বলেন, 'তুমি কার সঙ্গে যাচ্ছ?' খেয়াল করে দেখি আমি যার সঙ্গে হাঁটছি তিনি আমার বাবা নন। তার পর থেকে স্কুল শেষে ফেরার পথে বাবার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতাম।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও একাকিত্ব
বড় হয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। নিজেকে কেমন যেন একা মনে হলো। বাবা আমাকে হলে উঠিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। সেই রাতে একটুও ঘুমাতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে যাওয়ার সময় বাবা আর হাত ধরে নিয়ে যান না। তাই বাড়িতে গেলে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি বাবার বকেয়া সব আদর।
হঠাৎ অসুস্থতা ও বাবার ছুটে আসা
হলে থাকতে একবার হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়লাম। বন্ধুরা হাসপাতালে ভর্তি করাল। জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছি। এর আগে ওরকম অসুস্থ কখনো হইনি। ভীষণ অসহায় লাগছিল। বাবা মাগুরা থেকে সেই রাতে ছুটে এলেন। তাঁর অবস্থা পাগলপ্রায়। তিনি আমার পাশে বসে শক্ত করে হাতটা ধরলেন। কী এক জাদু—মুহূর্তে যেন সুস্থ হয়ে গেলাম। বাবা সারা দিন এবং রাত ১১টা পর্যন্ত আমার পাশে বসে থাকলেন। সারা রাত ওয়ার্ডের বাইরে দাঁড়িয়ে একটা রাত নির্ঘুম কাটালেন। আমাকে যখন রিলিজ দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো, বাসের মধ্যে সারাটা পথ বাবার কাঁধে মাথা রেখে দিলাম। বাড়িতে এসে বাবা প্রতিদিন স্নান করিয়ে দিতেন। তাঁর নিবিড় পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে উঠলাম।
জীবনের বাস্তবতা ও বাবার স্মৃতি
জীবনের অমোঘ নিয়মে সুস্থ হয়ে ফিরে এলাম ঢাকায়। নিরাপত্তাহীন যান্ত্রিক জীবনে বারবার আশপাশে ভুল মানুষকে দেখি। নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। মনে মনে ফিরে যাই সেই শিশু শ্রেণিতে। সব ভুলের মধ্যে কখন বাবা এসে শক্ত করে আমার হাত ধরে বলবেন, 'এই দেখো, আমি তোমার বাবা।' কেটে যাবে আমার অসহায়ত্ব, সব অসুখ। খুব ভালো থেকো বাবা।
লেখক: শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়



