গরম আবহাওয়া কি সত্যিই মানুষকে অলস করে? অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ
গরম আবহাওয়া কি মানুষকে অলস করে? অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

তাপমাত্রা মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে একটি দেশের মাথাপিছু জিডিপি সাড়ে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। নিরক্ষরেখার কাছাকাছি দেশগুলো কেন তুলনামূলক গরিব, সেই বিতর্কে অর্থনীতি ও ভূগোলের হিসাব ভিন্ন কথা বলে। প্রাচীন দার্শনিক অ্যারিস্টটল বা মন্টেস্কু গরম আবহাওয়াকে মানুষের অলসতা ও নিরুৎসাহের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলেও বাস্তবতা আরও জটিল।

তাপমাত্রা ও উৎপাদনশীলতার সম্পর্ক

গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। আবহাওয়া যখন খুব গরম থাকে, মস্তিষ্ক অনেকটা পাওয়ার সেভ মোডে চলে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় আর্দ্রতা। বাতাসে আর্দ্রতা ১০০ শতাংশ হয়ে গেলে শরীরের ঘাম শুকায় না, ফলে শরীর প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার উপায় হারিয়ে ফেলে। তখন কায়িক পরিশ্রম প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মানুষ অলস নয়, মূলত চরম আবহাওয়া তাদের কাজ করতে দেয় না।

রোগবালাই ও অর্থনৈতিক প্রভাব

উষ্ণ আবহাওয়ায় ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু বা ইয়েলো ফিভারের মতো রোগ দ্রুত ছড়ায়। অসুস্থ মানুষ কাজ করতে পারে না, ফলে অর্থনীতি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই রোগবালাইয়ের কারণেই ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা নিরক্ষীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চায়নি। তারা বরং সেখানে এমন শাসনব্যবস্থা তৈরি করেছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল শুধু সম্পদ লুট করে নিজেদের দেশে পাচার করা। ফলে উষ্ণ দেশগুলোতে কখনোই দীর্ঘমেয়াদি ও মজবুত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয়

মানবজাতির উদ্ভব আফ্রিকায় হলেও গরম দেশের মানুষ চরম গরম জায়গাগুলোতে থাকে না। কেনিয়ার নাইরোবি বা ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবার গড় তাপমাত্রা ইউরোপের লিসবন বা মাদ্রিদের চেয়েও কম। লাতিন আমেরিকার কলম্বিয়ার বড় শহরগুলো—বোগোতা, মেদেইয়িন বা কালি পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। বোগোতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৬০০ মিটার উঁচুতে। নিরক্ষরেখার কাছাকাছি দেশগুলোর রাজধানী সাধারণত উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে গড়ে উঠেছে। নিচু সমতল ভূমির অসহ্য গরম, আর্দ্রতা ও রোগবালাই থেকে বাঁচতেই মানুষ পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। পাহাড়ে আবহাওয়া ঠান্ডা, আর্দ্রতা কম ও মশার উৎপাত নেই। ইনকা সভ্যতার মতো বিশাল সাম্রাজ্যও গড়ে উঠেছিল বিষুবরেখার পাহাড়ি অঞ্চলেই।

পাহাড়ের অর্থনৈতিক বাধা

আরামদায়ক আবহাওয়ার বড় দাম চোকাতে হয়েছে এসব দেশের অর্থনীতিকে। পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা সবচেয়ে বড় সমস্যা। সেখানে পণ্য পরিবহনের উপযোগী নদী নেই। পাহাড় কেটে রাস্তাঘাট বা রেললাইন বানানো ভীষণ ব্যয়বহুল। পরিবহন খরচ বেশি মানেই ব্যবসা-বাণিজ্য কমে যাওয়া। মেক্সিকো বা ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর পিছিয়ে পড়ার পেছনে এটি বড় কারণ। পাহাড়ের কারণে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয় এবং মানুষের মধ্যে বিভাজন বাড়ে। দুর্গম যোগাযোগের কারণে এক উপত্যকার মানুষ অন্য উপত্যকার মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে না। প্রত্যেকে নিজেদের মতো করে আলাদা সংস্কৃতি ও প্রথা গড়ে তোলে। এতে পারস্পরিক বিশ্বাস কমে যায় এবং সংঘাত বাড়ে। একে বলা হয় বলকানাইজেশন। লাতিন আমেরিকার পাহাড়ি কার্টেলগুলো কিংবা আফ্রিকার জাতিগত সংঘাতের পেছনে এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা বিশাল ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ কর্কটক্রান্তি রেখার ঠিক ওপরে অবস্থিত একটি সমতল বদ্বীপ। লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার দেশগুলোর মতো গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ নেই। এপ্রিল-মে মাসের তীব্র তাপপ্রবাহে পুরো দেশ জ্বলন্ত উনুনে পরিণত হয়। বঙ্গোপসাগর থেকে উড়ে আসা জলীয়বাষ্পের কারণে আর্দ্রতা এত বেশি থাকে যে থার্মোমিটারে তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস দেখালেও শরীরে সেটা অনুভূত হয় ৪২ বা ৪৩ ডিগ্রির মতো। সমতল ভূমি হওয়ায় কৃষিকাজ সহজ, যোগাযোগব্যবস্থা ভালো এবং নদীপথের সুবিধা থাকলেও চরম গরম ও আর্দ্রতা উৎপাদনশীলতা নীরবে খেয়ে ফেলছে। বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর মানুষের কাজের ঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।

সমাধানের পথ

শুধু পশ্চিমা উপনিবেশবাদীদের দোষ দিয়ে কাজ হবে না, বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে হবে। সমতল ও গরম এলাকাগুলোর জন্য দরকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো, সস্তায় এয়ার কন্ডিশনার এবং মশা ও রোগবালাই নির্মূলের আধুনিক ব্যবস্থা। পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত যোগাযোগ কাঠামোর উন্নয়ন। সূত্র: সায়েন্স ডিরেক্ট ডটকম।