গাইবান্ধা জেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের টেংগরজানী গ্রামে বিকেল হলেই শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, চাকরিপ্রার্থী যুবক ও প্রবীণরা ছুটে আসেন একটি টিনের ছাউনির ঘরের সামনে। এটি কোনো কোচিং সেন্টার নয়, বরং ‘বই ঘর পাঠাগার’ নামের একটি ছোট্ট গ্রন্থাগার। চারপাশজুড়ে বইয়ের সারি, কেউ উপন্যাসে ডুবে যায়, কেউ ইতিহাসের পাতা উল্টায়, আবার কেউ খুঁজে ফেরে স্বপ্নপূরণের দিশা।
এক তরুণের স্বপ্ন ও আত্মত্যাগ
পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠাতা মেহেদী হাসান (২৪), গাইবান্ধা সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত মেহেদী গ্রামের শিশু-কিশোরদের বই পড়ার সীমিত সুযোগ দেখে উদ্বুদ্ধ হন। ২০২০ সালে তিনি কলেজে যাতায়াতের ভাড়া ও টিফিনের টাকা সঞ্চয় করে, পরিচিতজনদের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করে বাড়ির সামনে গড়ে তোলেন ছোট্ট পাঠাগারটি। বাবা-মায়ের সহযোগিতায় এটি বর্তমানে আড়াই হাজারেরও বেশি বইয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহে পরিণত হয়েছে।
পাঠাগারের সংগ্রহ ও কার্যক্রম
পাঠাগারটিতে শিশুসাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, বাংলা ও বিশ্বসাহিত্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ, জীবনী, কবিতা, ছোটগল্প, ভাষাতত্ত্ব, অর্থনীতি, রাজনীতি ও বিভিন্ন লেখকের রচনাসমগ্র রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় দৈনিক, সাময়িকী ও দুষ্প্রাপ্য প্রকাশনাও সংরক্ষিত আছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন পাঠক নিয়মিত বই ও পত্রিকা পড়েন এবং নির্ধারিত নিয়মে বই বাড়িতেও নিয়ে যেতে পারেন। ইতোমধ্যে পাঠাগারটি গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের তালিকাভুক্তির সনদ অর্জন করেছে।
সমাজ পরিবর্তনে বইয়ের ভূমিকা
মেহেদী বিশ্বাস করেন, একটি ভালো বই একজন মানুষের জীবন ও সমাজের চিন্তা-চেতনা বদলে দিতে পারে। পাঠাগারের উদ্যোগে নিয়মিত জাতীয় দিবস উদযাপন, কবি-সাহিত্যিকদের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন, চিত্রাঙ্কন, সাধারণ জ্ঞান, গল্প লেখা, কবিতা আবৃত্তি, কুইজ প্রতিযোগিতা এবং গ্রামজুড়ে বই পড়ার কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার বলেন, “এই পাঠাগার আমাদের জন্য আশীর্বাদের মতো। প্রতিদিন এখানে এসে বই পড়ি। নতুন নতুন বিষয় জানতে পারছি, নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাচ্ছি।” আরেক শিক্ষার্থী আরাফাত বলেন, “আগে অবসর সময়ের বেশির ভাগই মোবাইলে কাটত। এখন বই বাড়িতে নিয়ে পড়ি, আবার ফেরত দিয়ে নতুন বই আনি। বই পড়ার অভ্যাস আমার জীবন ও চিন্তাভাবনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।”
বল্লমঝাড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুলফিকার রহমান বলেন, “মেহেদী হাসানের ‘বই ঘর পাঠাগার’ শুধু একটি পাঠাগার নয়, এটি আমাদের ইউনিয়নের গর্ব। সীমিত সামর্থ্যেও তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। সমাজের সবাই এগিয়ে এলে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আদর্শ জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হবে।”
ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক সোহাগ মৃধা বলেন, “এমন উদ্যোগ শুধু প্রশংসা করলেই হবে না। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই এই পাঠাগার আরও সমৃদ্ধ হবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে মেহেদী হাসান বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, একটি ভালো বই একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। তাই চাই, আমাদের গ্রামের শিশু-কিশোর ও তরুণরা মোবাইলের আসক্তি ছেড়ে বইয়ের কাছে ফিরে আসুক। এই ছোট্ট পাঠাগার শুধু বই পড়ার জায়গা নয়, এটি একটি মানবিক, সচেতন ও আলোকিত সমাজ গড়ার স্বপ্ন। যতদিন পারি, এই আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে চাই। সমাজের সচেতন মানুষ ও সরকারের সহযোগিতা পেলে একদিন এটি একটি আধুনিক গণপাঠাগারে পরিণত হবে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।”



