রাশিয়ার হজের উপেক্ষিত ইতিহাস
হজের আলোচনা দূরে থাক, সাধারণভাবে ইসলামের ইতিহাসের আলোচনাতেও রাশিয়ার ও সেখানকার মুসলমানদের প্রসঙ্গ সেভাবে স্থান পায় না। অথচ রুশ দেশ থেকে হজ সফরের কাহিনি কম চিত্তাকর্ষক নয়। অন্তত ইলিয়েন এম কেন রচিত ‘রাশিয়ান হজ: এম্পায়ার অ্যান্ড দ্য পিলগ্রিমেজ টু মক্কা’ বইটি তাই বলে।
গবেষণার ভিত্তি ও উপকরণ
গবেষণাধর্মী এ বইয়ে রুশ হাজিদের স্মৃতিচারণা, হজ বিষয়ে রুশ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও নিবন্ধ এবং রুশ কূটনীতিকদের সঙ্গে উসমানীয় ও হেজাজীয় শাসকদের বার্তা বিনিময়সহ আলাপচারিতাকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই সূত্রগুলো থেকে যে ছবি আঁকা হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে হজের ইতিহাসে রাশিয়ার হাজিরা এমন একটা অবস্থান তৈরি করেছেন, যা উপেক্ষিত হয়ে রয়েছে।
রাশিয়ায় ইসলামের প্রসার
রুশ সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলে বিস্তৃত হলে ইসলাম রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হয়ে ওঠে। দেশটিতে বরাবরই রুশ অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মের প্রাধান্য রয়েছে, যাকে প্রাচ্যের খ্রিস্টবাদ হিসেবেও অভিহিত করা হয়।
সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও সহায়তা
বইটিতে দেখানো হয়েছে যে জার ও সোভিয়েত আমলে রুশ সরকার তার মুসলিম প্রজা ও নাগরিকদের হজ সফরকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। একদিকে যেমন তাঁদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন পদক্ষেপ ছিল, অন্যদিকে আবার তাঁদের আনুগত্য আদায়ের প্রয়াসও ছিল। সর্বোপরি ছিল অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্যোগ, যার প্রতিফলন ঘটে হাজিদের দ্বারা রুশ-মালিকানাধীন জাহাজ ও রেল কোম্পানির টিকিট ক্রয়ের মাধ্যমে।
হজ সফরে সহযোগিতা করতে রুশ সরকার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের দিকে জোর দিয়েছিল, হাজিদের যাতায়াতে সহায়তার জন্য মুসলিম ও অমুসলিম কর্মীদল নিয়োগ দিয়েছিল। এসব অবকাঠামোর মধ্যে ছিল সরাইখানা নির্মাণ ও হেজাজ রেলপথ স্থাপনে অনুদান।
বইয়ের কাঠামো ও প্রকাশনা
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে জারের শাসনামল থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত সোভিয়েত শাসনকালে রাশিয়া থেকে হজ সফরের নানা অজানা ঘটনাপ্রবাহ ঠাঁই পেয়েছে বইটিতে। পৃথক সূচনা ও সমাপনীসহ মোট সাতটি অধ্যায়ে রচিত বইটি ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বেশ কিছু মানচিত্র ও ছবি স্থান পেয়েছে।
লেখকের বক্তব্য
বইটির প্রতিপাদ্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখক নিজে বলেছেন: ‘আমি যে কাহিনি এ বইয়ে তুলে ধরেছি, তাতে আধুনিক কালে বিশ্বের অন্যতম বড় পরিযায়ী চলাচলে রাশিয়ার সম্পৃক্ততা ফুটে উঠেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তীর্থযাত্রা ছিল হজ, যা একই সঙ্গে ছিল রাশিয়া থেকে একক বৃহত্তম তীর্থযাত্রা।’
ইলিয়েন আরও বলেছেন: ‘রাশিয়ার অভিবাসন ও পরিযায়ীবিষয়ক ইতিহাস রচনায় বিস্ময়করভাবে হজের অনুপস্থিতি হলো রাশিয়ার ইতিহাসে মুসলমানদের অবস্থান ও বয়ানের উপেক্ষার প্রতিফলন। অথচ ইউরোপ, জাপান ও রাশিয়ায় ইসলামবিষয়ক গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদরা তাঁদের কাজের মাধ্যমে হালযমানার ইউরেশিয়ায় মুসলমানদের সক্রিয় উপস্থিতি, চলাচল ও অন্যদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিষয়ে বেশ সমৃদ্ধ সাহিত্য রচনা করেছেন।’
মুসলমানদের চলনশীলতা
ইলিয়েন তাঁর এই কাজের মধ্য দিয়ে এটা দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে মুসলমানরা রাশিয়ার অন্যতম চলনশীল জনগোষ্ঠী, মানে যারা বাণিজ্যিক, ধর্মীয় ও পড়ালেখার কাজে ঘন ঘন রুশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে ও রুশ সীমানা অতিক্রম করেছে।
বইটির তথ্য: ‘রাশিয়ান হজ: এম্পায়ার অ্যান্ড দ্য পিলগ্রিমেজ টু মক্কা’; ইলিয়েন এম কেন; কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র, ২০১৫।



