সংকটময় মুহূর্তে শায়খ আহমাদুল্লাহর ৪ আমলের পরামর্শ
সংকটময় মুহূর্তে শায়খ আহমাদুল্লাহর ৪ আমল

মানুষের জীবন কখনো সুখের, কখনো দুঃখের। কঠিন বিপদ, দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তা মানুষকে অসহায় করে তোলে। এমন সময় একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় আল্লাহ তাআলা। বিপদ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও অনেক বড়। তাই হতাশ না হয়ে ধৈর্য, তাওবা, দোয়া ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়াই ইসলামের শিক্ষা।

শায়খ আহমাদুল্লাহর পরামর্শ

সম্প্রতি এক ইউটিউব আলোচনায় আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ কঠিন বিপদের সময় চারটি গুরুত্বপূর্ণ আমল নিয়মিত করার পরামর্শ দেন। তার ভাষায়, অনেক মানুষ এই আমলগুলো করে উপকৃত হয়েছেন। তবে তিনি এটিও স্মরণ করিয়ে দেন যে, কোনো বিপদ সঙ্গে সঙ্গে দূর না হলেও হতাশ হওয়া যাবে না। কারণ কখনো আমলের ঘাটতি থাকতে পারে, আবার কখনো বিপদের মধ্যেই আল্লাহ বান্দার জন্য কল্যাণ নির্ধারণ করে রাখেন।

১. বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন

বিপদ-আপদ, দুশ্চিন্তা কিংবা জীবনের জটিল মুহূর্তে সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। ইস্তিগফার শুধু গুনাহ মাফের মাধ্যম নয়; এটি রিজিক বৃদ্ধি, সংকট দূর এবং অন্তরে প্রশান্তি লাভেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। কুরআনের বাণী—فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ۝ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا ۝ وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ অর্থ: ‘আমি বলেছিলাম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন।’ (সুরা নূহ: আয়াত ১০–১২)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাদিসে পাকে এসেছে—مَنْ لَزِمَ الِاسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির পথ বের করে দেন, প্রতিটি সংকট থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা করে দেন এবং এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (আবু দাউদ ১৫১৮) তাই পড়তে পারেন—أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ — আস্তাগফিরুল্লাহ, أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ — আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।

২. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করুন

দরুদ শরিফ—اللهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْت َعَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন, ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহহিমা, ওয়া আলা আলি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম্মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিন, ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আলি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম্মাজিদ।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সা.) এবং তার পরিবার-পরিজনদের ওপর এমনভাবে রহমত বর্ষণ কর, যেমনভাবে করেছ ইবরাহিম ও তার পরিবার-পরিজনের ওপর। নিশ্চয় তুমি মহান এবং প্রশংসিত। হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সা.) এবং তার পরিবার-পরিজনদের ওপর এমনভাবে বরকত দাও, যেমনভাবে দিয়েছ ইবরাহিম ও তার পরিবার-পরিজনের ওপর। নিশ্চয় তুমি মহান এবং প্রশংসিত।’

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা মুমিনের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। এটি আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম। কুরআনের বাণী—إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তার প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করো।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৫৬) হাদিসে পাকে এসেছে—مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত বর্ষণ করেন।’ (মুসলিম ৪০৮)

৩. দোয়া ইউনুস বেশি বেশি পড়ুন

সংকট, দুশ্চিন্তা ও বিপদের সময় হজরত ইউনুস (আ.)-এর এই দোয়াটি পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। কুরআনের দোয়া—لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ উচ্চারণ: ‘লা ইলাহা ইল্লা আংতা সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজ জ্বলিমিন।’ অর্থ: ‘আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা আল-আম্বিয়া: আয়াত ৮৭) হাদিসে পাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি কোনো বিষয়ে এই দোয়া করে, আল্লাহ অবশ্যই তার দোয়া কবুল করেন।’ (তিরমিজি ৩৫০৫)

৪. ‘ইয়া জাল-ঝালালি ওয়াল ইকরাম’ বেশি বেশি পড়ুন

আল্লাহর এই মহান নামটি বেশি বেশি জিকির করার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) উৎসাহ দিয়েছেন। يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ ‘ইয়া জাল-ঝালালি ওয়াল ইকরাম’—এই দোয়াটি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং বেশি বেশি পড়ো।’ (তিরমিজি ৩৫২৪) এই জিকিরের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর মহিমা, মর্যাদা ও অনুগ্রহের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে।

এর সঙ্গে আরও যা করতে পারেন

শায়খ আহমাদুল্লাহর পরামর্শ অনুযায়ী, কঠিন সময়ে—তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা, বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া, আন্তরিকভাবে দোয়া করা এবং ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। এসব আমল একজন মুমিনের অন্তরে শক্তি ও প্রশান্তি এনে দেয়।

জীবনের প্রতিটি বিপদ একজন মুমিনের জন্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সফলতার পথ হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, গুনাহ থেকে তাওবা করা, বেশি বেশি ইস্তিগফার, দরুদ ও জিকির করা এবং ধৈর্যের সঙ্গে তার সাহায্য কামনা করা।

মনে রাখতে হবে

আল্লাহ তাআলা কখনো তার বান্দাকে নিরাশ করেন না। কোনো দোয়া সঙ্গে সঙ্গে কবুল না হলেও তিনি তা উত্তম সময়ের জন্য সংরক্ষণ করেন অথবা এর বিনিময়ে আরও বড় কোনো অনিষ্ট দূর করে দেন। তাই সংকট যতই গভীর হোক, একজন মুমিনের আশা, ভরসা ও প্রার্থনা কখনো শেষ হওয়া উচিত নয়।