ইসলামে খেলাধুলা নিষিদ্ধ নয়; বরং শরীরচর্চা ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে, তবে তা অবশ্যই শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে হতে হবে এবং ইবাদত ও দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। সম্প্রতি এক অনলাইন লাইভ প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় ইসলামি আলোচক শায়েখ আহমাদুল্লাহ এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
খেলাধুলা কি ইসলামে নিষিদ্ধ?
প্রশ্নোত্তর পর্বে এক ব্যক্তি শায়েখ আহমাদুল্লাহকে প্রশ্ন করেন, ইসলামে খেলাধুলার বিধান কী? সাম্প্রতিক সময়ে কিছু আলেমের বক্তব্য দেখে অনেকের মনে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যেন কোনো খেলাধুলাই করা যাবে না। অথচ একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য বিনোদনের প্রয়োজন রয়েছে।
জবাবে শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক বিনোদনের ব্যবস্থা রেখেছেন। একটি সুখী ও আনন্দময় পারিবারিক জীবন মানসিক প্রশান্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তিনি বলেন, ইসলাম সুন্দর পারিবারিক জীবন গঠনে গুরুত্ব দিয়েছে, কিন্তু আধুনিক সমাজে মানুষ এই পারিবারিক আবহ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
পারিবারিক বন্ধন ও মানসিক প্রশান্তি
পারিবারিক বন্ধনের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি অর্জিত হয়। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ করতে পারো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।” (সুরা আর-রূম: আয়াত ২১)
শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তাআলা তার সঙ্গী হিসেবে হজরত হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করেন, যাতে তিনি তার সান্নিধ্যে মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থারই একটি অংশ।
কৃত্রিম বিনোদন বনাম প্রকৃত সুখ
তিনি বলেন, বর্তমানে খেলাধুলা দেখা ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজনের মাধ্যমে মানুষ যে সুখ খুঁজছে, তা আদৌ প্রকৃত সুখ এনে দিচ্ছে কি না—এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, খেলাধুলা ও বিনোদনের বিপুল আয়োজন থাকা সত্ত্বেও বিষণ্নতা ও মানসিক অস্থিরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। কারণ মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত স্বাভাবিক প্রশান্তির পথ ছেড়ে কৃত্রিম আনন্দের পেছনে ছুটছে।
তিনি আরও বলেন, এই কৃত্রিম বিনোদন মানুষকে প্রকৃত সুখ দিতে পারে না; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা মানুষকে আরও অস্থির ও বিষণ্ন করে তোলে।
ইসলামে খেলাধুলার বৈধতা
শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, ইসলামে খেলাধুলা ঢালাওভাবে নিষিদ্ধ নয়। বরং যেসব খেলায় শরীরচর্চা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাস্তব জীবনের উপকারিতা রয়েছে, ইসলাম সেগুলোকে উৎসাহিত করেছে। তিনি নবী করিম (সা.)-এর হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতার ঘটনা উল্লেখ করেন।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। একবার আমি তাকে হারিয়েছিলাম, পরে আরেকবার তিনি আমাকে হারিয়ে বললেন, ‘এটি আগেরবারের বদলা।’ (আবু দাউদ ২৫৭৮)
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোড়দৌড়, তীরন্দাজি এবং শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে—এমন বিভিন্ন প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করেছেন। তাই যেসব খেলায় শরীরচর্চার সুযোগ রয়েছে এবং যা মানুষের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায়, শরিয়ত সেগুলোকে নিষিদ্ধ করেনি।
আধুনিক খেলাধুলা: ফুটবল, ক্রিকেট
একইভাবে ফুটবল, ক্রিকেটসহ আধুনিক খেলাধুলাও বৈধ, যদি সেখানে শরিয়তবিরোধী কোনো বিষয় না থাকে। যেমন সতর উন্মুক্ত না হওয়া, জুয়া বা বাজি না থাকা এবং কোনো হারাম কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়া।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো বৈধ খেলাও যখন মানুষের কাছে জীবনের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, ইবাদত-বন্দেগি থেকে দূরে সরিয়ে দেয় কিংবা দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলার কারণ হয়, তখন সেটি শরিয়তের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে কুরআনে বলা হয়েছে—
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের সম্পদ ও সন্তান যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে।” (সুরা আল-মুনাফিকুন: আয়াত ৯)
নিষিদ্ধ খেলা: পাশা ও জুয়া
পরিশেষে তিনি বলেন, যেসব খেলায় কোনো শারীরিক উপকারিতা নেই এবং যা কেবল সময় নষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যেমন—পাশা খেলা; এসব বিষয়ে ইসলামে কঠোর সতর্কতা রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“যে ব্যক্তি পাশা খেলল, সে যেন শূকরের গোশত ও রক্তে নিজের হাত ডুবাল।” (মুসলিম ২২৬০)
শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, তাস, পাশা কিংবা জুয়ায় রূপ নেওয়া এ ধরনের খেলাগুলো মানুষকে গঠনমূলক কোনো উপকার দেয় না; বরং অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো মানসিক অস্থিরতা, সময়ের অপচয় এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
উপসংহার
ইসলামের দৃষ্টিতে খেলাধুলা কোনোভাবেই নিষিদ্ধ নয়। বরং শরীর সুস্থ রাখা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বৈধ বিনোদনের উদ্দেশ্যে খেলাধুলা উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে শর্ত হলো—এতে যেন হারাম কোনো উপাদান না থাকে, ইবাদত ও দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয় এবং তা যেন মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হয়ে না দাঁড়ায়। অর্থাৎ ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার শিক্ষা দেয়, যেখানে বিনোদন থাকবে, কিন্তু তা হবে আল্লাহর বিধান ও নৈতিকতার সীমারেখার ভেতরে।



