কাবা শরীফ নির্মাণের ইতিহাস: ফেরেশতা থেকে কুরাইশ পর্যন্ত
কাবা শরীফ নির্মাণের ইতিহাস: ফেরেশতা থেকে কুরাইশ

পবিত্র কাবা শরীফ ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান। এটি পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত প্রথম ঘর। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, 'নিশ্চয়ই মানুষের জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর স্থাপিত হয়েছে, তা তো মক্কায় অবস্থিত, যা বরকতময় এবং সমগ্র জগতের মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ।' (সুরা আলে ইমরান: আয়াত, ৯৬) মক্কা নগরীকে উম্মুল কুরা বা জনপদসমূহের মা বলা হয় এবং কুরআনে একে নিরাপদ নগরী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে: 'শপথ এই নিরাপদ নগরের।' (সুরা আত-ত্বীন: আয়াত, ৩)

কাবা নির্মাণের ধারাবাহিক ইতিহাস

ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, সর্বপ্রথম ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশে কাবা ঘর নির্মাণ করেন। এটি সপ্তম আকাশের বাইতুল মামুরের বরাবর নির্মিত হয়। দ্বিতীয় নির্মাতা ছিলেন আদম (আ.) ও তার তৃতীয় পুত্র শীষ (আ.)। তবে নুহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনে আদম (আ.)-এর নির্মিত কাবা ভবন বিলীন হয়ে যায়।

ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর নির্মাণ

ইবরাহিম (আ.)-এর সময়ে কাবার কোনো নিদর্শন অবশিষ্ট ছিল না। আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে তাকে প্রাচীন ভিত দেখিয়ে দেন এবং নতুন করে কাবা নির্মাণের নির্দেশ দেন। ইবরাহিম ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.) মিলে এই পবিত্র ঘর নির্মাণ করেন। কুরআনে বলা হয়েছে: 'আর স্মরণ করো, যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবার ভিত্তি উঁচু করছিলেন এবং বলছিলেন, হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।' (সুরা বাকারা: আয়াত, ১২৭) নির্মাণ শেষে ইবরাহিম (আ.) মানুষকে হজের জন্য আহ্বান করেন। ইবনে কাসিরের মতে, সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে যারা 'লাব্বাইক' বলেছিল, দুনিয়াতে তাদের হজ নসিব হয়েছে এবং হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরবর্তীকালের সংস্কার ও নির্মাণ

ইবরাহিম (আ.)-এর পর বহুবার কাবা ঘরের নির্মাণ ও সংস্কার হয়েছে। আমালেকা সম্প্রদায় একবার কাবা ঘর ধসে পড়লে তারা পুনর্নির্মাণ করে। পরবর্তীতে ধসে গেলে বনু জুরহুম গোত্র কাবা নির্মাণের সৌভাগ্য লাভ করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কুরাইশ বংশের সংস্কার

রাসুল (সা.)-এর নবুয়তের পূর্বে কুরাইশরা কাবা সংস্কার করে। তারা কাজটি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। বনু আবদে মানাফ ও বনু জুহরা দরজার দায়িত্ব নেয়। বনু মাখজুম ও অন্যান্য গোত্র রুকনু আসওয়াদ ও রুকনু ইয়ামানির মধ্যবর্তী অংশের দায়িত্ব নেয়। বনু জুমাহ ও সাহমা ছাদ নির্মাণ করে। বনু আবদুদ-দার, বনু আসাদ ও বনু আদি হাতিমের অংশ সংস্কার করে। হাতিম বা হিজর মূলত কাবার অংশ ছিল, কিন্তু বৈধ অর্থের অভাবে কুরাইশরা তা অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি। এ সময় কুরাইশরা একটি বড় পরিবর্তন আনে: আগে কাবার দুটি দরজা ছিল, পূর্ব ও পশ্চিম পাশে; তারা পশ্চিম পাশের দরজাটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় (সিরাত ইবনে হিশাম)।

হাজরে আসওয়াদ স্থাপন ও রাসুল (সা.)-এর ফয়সালা

নির্মাণ শেষে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে গোত্রগুলোর মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। কয়েক দিন পর তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আগামীকাল যে ব্যক্তি প্রথম কাবায় প্রবেশ করবে, সে-ই ফয়সালা দেবে। পরদিন রাসুল (সা.) সর্বপ্রথম প্রবেশ করেন। তাকে দেখে সবাই বলে উঠল, 'ইনি তো আল-আমিন, আমরা তার সিদ্ধান্ত মেনে নেব।' রাসুল (সা.) একটি চাদর আনতে বলেন। নিজ হাতে পাথরটি চাদরে রেখে প্রত্যেক গোত্রের নেতাকে চাদরের একপাশ ধরতে বলেন। এরপর সবাই মিলে পাথরটি নির্দিষ্ট স্থানে নিলে তিনি নিজ হাতে তা স্থাপন করেন।

কুরাইশরা ইবরাহিমি ভিত্তিতে পরিবর্তন আনায় রাসুল (সা.) আয়েশাকে (রা.) বলেছিলেন: 'হে আয়েশা! তোমার কওম যদি নতুন মুসলিম না হতো, তবে আমি কাবা ঘর ভেঙে ভূমির সমতলে স্থাপন করতাম। এর দুটি দরজা করতাম, একটি পূর্বে অপরটি পশ্চিমে। আর হাতিমের ছয় গজ কাবার অন্তর্ভুক্ত করতাম। কেননা কুরাইশরা নির্মাণের সময় এর ভিত্তি ছোট করে দিয়েছে।' (সহিহ মুসলিম)

পরবর্তী নির্মাণ

আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) ৬৪ হিজরিতে রাসুল (সা.)-এর ইচ্ছা অনুযায়ী ইবরাহিমি ভিত্তির উপর কাবা পুনর্নির্মাণ করেন এবং হাতিমকে অন্তর্ভুক্ত করেন। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ৭৪ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরকে শহিদ করে তার নির্মিত ভবন ভেঙে কুরাইশি ভিত্তির উপর আবার কাবা নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে এক ন্যায়পরায়ণ শাসক আবার ইবরাহিমি ভিত্তিতে কাবা নির্মাণ করতে চাইলে ইমাম মালিক (রহ.) নিষেধ করেন। তিনি বলেন, বারবার নির্মাণ হলে প্রত্যেক শাসক নিজের কীর্তি রাখতে চাইবে; এতে এই পবিত্র গৃহের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে। বর্তমানে কাবা হাজ্জাজের নির্মাণের উপরই প্রতিষ্ঠিত। তবে প্রতিবছর কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হয়।