বডি শেমিং: ইসলামে শরীর নিয়ে মন্তব্য কেন বড় পাপ?
বডি শেমিং: ইসলামে শরীর নিয়ে মন্তব্য কেন বড় পাপ?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই এখন একটা নির্দিষ্ট ধরনের শরীর চোখে পড়ে—কাটা কাটা পেশি, সরু কোমর, নিখুঁত অনুপাত। এই ছবিগুলো দেখতে দেখতে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের শরীরকে একটি প্রকল্পের মতো ভাবতে শুরু করে। যেন তেমন হলেই দাম আছে, না হলে নেই। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় বডি শেমিং—অন্যের শরীর নিয়ে উপহাস, ট্রলিং, নানা রকম খোঁচা। বিষয়টা নতুন নয়, শুধু মাধ্যমটা নতুন। মানুষের বাহ্যিক গঠন নিয়ে রসিকতা বোধ হয় মানবসভ্যতার পুরোনো অভ্যাস। তবে এর বিরুদ্ধে যে অবস্থান নেওয়া হয়েছিল দেড় হাজার বছর আগে, সেটা আজও প্রাসঙ্গিক।

ইসলামে শরীরচর্চার গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা

শরীরচর্চার যে তাগিদ ইসলামে আছে, আগে একটা ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। ইসলাম শরীরচর্চার বিরুদ্ধে নয়, বরং সুস্থ ও কর্মক্ষম শরীরকে সে আল্লাহর দেওয়া আমানত মনে করে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘দুর্বল মুমিনের তুলনায় শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়, তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ আছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪) নবীজি (সা.) নিজে সাহাবিদের মধ্যে তীর নিক্ষেপ, ঘোড়দৌড় ও কুস্তির মতো শারীরিক কসরতে উৎসাহ দিতেন। আরবের তৎকালীন বিখ্যাত কুস্তিগির রুকানার সঙ্গে তাঁর কুস্তির ঘটনা সিরাতের গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ সুস্থ থাকার চেষ্টাকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করে না।

সমস্যা হয় তখন, যখন সুস্থতার উদ্দেশ্যটাই বদলে যায়। আধুনিক ফিটনেস সংস্কৃতির একটা বড় অংশ আর সুস্থতার জন্য নয়—সেটা প্রদর্শনের জন্য। জিম করা হয় ছবি তোলার জন্য, ডায়েট মানা হয় তুলনার জন্য। এই যাত্রায় শরীর সুস্থ হয় হয়তো, কিন্তু মানসিকতায় জন্ম নেয় একধরনের শ্রেষ্ঠত্বের বোধ—আমার শরীর ভালো, তাই আমি ভালো।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অহংকার ও বডি শেমিং: কোরআনের নির্দেশনা

কোরআন এই মানসিকতার বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলেছে, ‘তুমি অহংকারবশত মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে দম্ভভরে বিচরণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও আত্ম–অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৮) এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে, শরীর বা সম্পদ নিয়ে অহংকার ইসলামে নিষিদ্ধ। বডি শেমিং মূলত এই অহংকারেরই বহিঃপ্রকাশ—অন্যের শরীরকে নিজের থেকে নিকৃষ্ট মনে করা।

সাহাবিদের জীবনে বডি শেমিং: শিক্ষণীয় ঘটনা

নবীজি (সা.)-এর সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) একদিন একটা গাছের ডাল ভাঙতে ওপরে উঠলেন। বাতাসে তাঁর কাপড় সরে গেলে চিকন পা দুটো দেখে কেউ কেউ হাসলেন। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী দেখে হাসছ?’ তাঁরা বললেন, তাঁর পায়ের চিকন গঠন দেখে। তিনি বললেন, ‘সেই আল্লাহর কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ—কেয়ামতের দিন মিজানের পাল্লায় এই দুটো পা ওহুদ পাহাড়ের চেয়েও ভারী হবে’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৩৯৯১)। হাসিটা ছিল মুহূর্তের। কিন্তু নবীজির প্রতিক্রিয়া বলে দিল, মানুষের শরীর নিয়ে হাসাহাসি কতটা গুরুতর।

আরেকটি ঘটনা আরও সরাসরি। একবার আয়েশা (রা.) আরেকজনের সম্পর্কে তাঁর খাটো–উচ্চতার ইঙ্গিত করে কিছু একটা বললেন। নবীজি (সা.) বললেন, ‘তুমি এমন একটি কথা বললে, যা যদি সমুদ্রের পানিতে মিশিয়ে দেওয়া হতো, তবে সমুদ্রের রং ও স্বাদ বদলে যেত।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৭৫) যিনি বলছেন, তিনি নবীজির প্রিয় স্ত্রী। যা বলা হয়েছে, তা হয়তো ছোট্ট একটা মন্তব্য। তবু এত সতর্কতা।

মর্যাদার প্রকৃত মাপকাঠি

কোরআনে আছে, ‘আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সর্বোত্তম গঠনে।’ (সুরা তিন, আয়াত: ৪)। অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের শরীর—লম্বা হোক, খাটো হোক, মোটা হোক, রোগা হোক—আল্লাহর সৃষ্টি। সেই সৃষ্টি নিয়ে উপহাস করা মানে পরোক্ষে সেই সৃষ্টির বিচার করা। আর মর্যাদার মাপকাঠি কোথায়? নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের শরীর এবং বাহ্যিক আকৃতি দেখেন না, তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪) তাই বডি শেমিং শুধু সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি গুরুতর পাপ।

সুস্থতার সংস্কৃতি বনাম প্রদর্শনের সংস্কৃতি

জিমে যাওয়া ভালো, সুস্থ থাকা ভালো। কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিখুঁত মনে করা এবং অন্যকে অপূর্ণ মনে করা—এই দুটি মিলিয়ে যে সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, সেটা সুস্থতার সংস্কৃতি নয়। ইসলাম আমাদের শেখায়, শরীরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখতে, অহংকার না করে বিনয়ী হতে, এবং অন্যের শরীর নিয়ে কটূক্তি না করতে। বডি শেমিং থেকে বাঁচতে হলে নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা জরুরি, যেখানে অন্যের প্রতি সহানুভূতি ও সম্মান থাকে।