ইতিহাসের পাতায় ১২ রমজান: তুলুনি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, মসজিদ নির্মাণ ও বিজয়ের স্মৃতি
১২ রমজান: তুলুনি রাষ্ট্র, ইবনে তুলুন মসজিদ ও ঐতিহাসিক ঘটনা

ইতিহাসের পাতায় ১২ রমজানের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

ইতিহাসের পাতায় ১২ রমজান একটি বিশেষ দিন হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে জ্ঞান, স্থাপত্য এবং সামরিক বিজয়ের নানা অধ্যায় সংযুক্ত রয়েছে। এই দিনে মিসরের নীল নদের তীরে সামাররার স্থাপত্যশৈলী নিয়ে এক নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে, আবার বাগদাদের আকাশ ভারী হয় কালজয়ী জ্ঞানসাধকের বিদায়ি শোকে। নিচে এই দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

তুলুনি সালতানাতের অভ্যুদয়

২৫৪ হিজরির ১২ রমজান, যা ৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দের সমতুল্য, মামলুক বংশোদ্ভূত সাহসী সেনাপতি আহমদ ইবনে তুলুন মিশরে গভর্নর হিসেবে প্রবেশ করেন। আব্বাসীয় খিলাফতের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তিনি মিসরে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র ‘তুলুনি সালতানাত’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসন–দক্ষতায় মিসর একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

তিনি একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং উন্নত প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেন, যা কায়রোকে তৎকালীন বাগদাদের সমকক্ষ করে তোলে। এই ঘটনা ইসলামি ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইবনে তুলুন মসজিদের নির্মাণ

১১ বছর পর, ২৬৫ হিজরির ১২ রমজান (৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) কায়রোতে ইবনে তুলুন মসজিদের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। এই মসজিদটি আব্বাসীয় কেন্দ্র থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীকী ঘোষণা হিসেবে কাজ করে। স্থপতি সাইদ ইবনে কাতিব আল-ফারগানির নকশা করা এই মসজিদটি প্রাচীন মিসরের মার্বেল স্তম্ভের বদলে মজবুত ইটের ওপর নির্মিত হয়।

এর বিখ্যাত ‘পেঁচানো মিনার’ আজও ইবনে তুলুনের ইরাকি সামরিক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দেয়। মসজিদ নির্মাণের জন্য তিনি সাধারণ মানুষের করের টাকা ব্যবহার না করে মুকাত্তাম পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ১২ লক্ষ দিনার মূল্যের গুপ্তধন খুঁজে পান এবং সেই অর্থ ব্যয় করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইবনে জাওজির বিদায়

৫৯৭ হিজরির ১২ রমজান (১২০১ খ্রিষ্টাব্দ) আব্বাসীয় বাগদাদ বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ ইবনে জাওজিকে হারায়। তিনি প্রায় ৩০০টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে আল-মুনতাজাম ইতিহাসের এক অমূল্য আকর হিসেবে স্বীকৃত।

তাঁর জানাজার দিন বাগদাদের সমস্ত বাজার বন্ধ হয়ে যায় এবং লাখো মানুষ তাঁদের প্রিয় ওস্তাদকে শেষ বিদায় জানাতে রাজপথে নেমে আসেন। ইতিহাসবিদরা একে বাগদাদের ইতিহাসের অন্যতম ‘বৃহৎ জানাজা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁকে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর সমাধির পাশে দাফন করা হয়।

আন্তাকিয়া বিজয়

৬৬৬ হিজরির ১২ রমজান (১২৬৮ খ্রিষ্টাব্দ) সুলতান জহির বাইবার্স আন্তাকিয়া শহরকে ক্রুসেডারদের থেকে মুক্ত করেন। ১৭০ বছর ধরে আন্তাকিয়া ছিল ক্রুসেডারদের অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি। ৪ রমজান শহর জয় হলেও ১২ রমজান নাগাদ দুর্ভেদ্য কেল্লাটির ওপর মুসলিমদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

সালাহউদ্দিন আইয়ুবির হিত্তিন যুদ্ধের পর এটিই ছিল মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে বিবেচিত। এই ঘটনা ইসলামি ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায় যোগ করে।

সর্বোপরি, ১২ রমজান ইতিহাসের পাতায় জ্ঞান, স্থাপত্য এবং সামরিক বিজয়ের এক অনন্য সমন্বয় হিসেবে স্থান পেয়েছে, যা মুসলিম বিশ্বের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।