বাংলাদেশে ব্যবসা করলেও কোনো অফিস বা স্থায়ী উপস্থিতি নেই—এমন বিদেশি ওটিটি (ওভার দ্য টপ) প্ল্যাটফর্মগুলোকে করের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ নির্ধারণে অর্থবিল ২০২৬-এ নতুন একটি মানদণ্ড প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন মানদণ্ড: এক লাখ গ্রাহক হলেই ডিজিটাল উপস্থিতি
অর্থবিলের প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো অনাবাসী বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে এক লাখ বা তার বেশি ডিজিটাল গ্রাহক বা সাবস্ক্রাইবার থাকলে তাদের ডিজিটাল উপস্থিতি রয়েছে বলে গণ্য করা হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি দেশের কর আইনের আওতায় আসতে পারে। সে জন্য গ্রাহকসংখ্যার ভিত্তিতে তাদের ‘স্থায়ী স্থাপনা’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
নাম প্রকাশ না করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর বিভাগের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্থায়ী স্থাপনা না হলে করারোপের অধিকার স্থাপিত হয় না। তাই আমরা এসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে স্থায়ী স্থাপনা হিসেবে অভিহিত করেছি। এটা করারোপের প্রাথমিক ধাপ।’ তবে আইনি জটিলতায় এবারই করারোপ করা না গেলেও করারোপের এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো নজরদারির আওতায়
নতুন এ বিধানের ফলে জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যক্রম কর কর্তৃপক্ষের নজরদারির আওতায় আসবে। বাংলাদেশে বর্তমানে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা ভিডিও স্ট্রিমিং সেবার মধ্যে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, ডিজনি প্লাস হটস্টার ও হইচই এগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়। এসব প্ল্যাটফর্মের বিপুলসংখ্যক গ্রাহকও রয়েছে। প্রতিনিয়ত এসব প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা ও গ্রাহকসংখ্যা বাড়ছে।
ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে বহু বিদেশি প্রতিষ্ঠান কোনো ভৌত অফিস ছাড়াই বাংলাদেশের বাজার থেকে আয় করছে। কিন্তু প্রচলিত করকাঠামোয় এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক আয় করের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। নতুন বিধানের মাধ্যমে সেই ঘাটতি দূর করতে চায় সরকার। স্থায়ী স্থাপনা হিসেবে সংজ্ঞায়িত হলে দেশের করপোরেট করহার বা সাড়ে ২৭ শতাংশ হারে কর দিতে হবে এসব বিদেশি স্ট্রিমিং কোম্পানিকে।
দ্বৈতকর চুক্তি বড় বাধা
তবে দ্বৈতকর পরিহারে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে করা চুক্তির কারণে নতুন অর্থবিল কার্যকর করা কঠিন হবে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, নেটফ্লিক্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানি। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের করা দ্বৈত চুক্তিতে অফিস না থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ‘স্থায়ী স্থাপনা’ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। বাংলাদেশের ৪৩টি দেশের সঙ্গে এমন চুক্তি রয়েছে। ফলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে করারোপ করা কতটা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে খোদ এনবিআর কর্মকর্তারাও নিশ্চিত হতে পারছেন না।
কর বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, অর্থবিল দিয়ে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে করারোপ বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। তাঁদের মতে, এটা করতে গেলে আগে দ্বৈত চুক্তিতে পরিবর্তন আনতে হবে। তবেই কেবল করারোপ করা সম্ভব হবে।
জানতে চাইলে কর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ‘আমাদের আয়কর আইন অনুযায়ী, স্থানীয় আইনের চেয়ে আন্তর্জাতিক দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি বেশি প্রাধান্য পায়। প্রচলিত চুক্তিগুলোয় করারোপের জন্য প্রতিষ্ঠানের সরাসরি উপস্থিতির ওপর জোর দেওয়া হয়। তাই এই আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সংশোধন না করা পর্যন্ত নতুন নিয়মটি কার্যকর করলেও কর আহরণ সম্ভবপর না–ও হতে পারে।’
যথাযথ গবেষণা ছাড়া এ আইন বাস্তবায়ন করতে গেলে বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন স্নেহাশীষ বড়ুয়া।



