অনুদানের টাকা না পেয়ে শুটিং নিয়ে অনিশ্চয়তায় ১২ সিনেমার প্রযোজক
অনুদানের টাকা না পেয়ে শুটিং নিয়ে অনিশ্চয়তায় ১২ সিনেমা

২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনুদান পাওয়া ১২টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের শুটিং নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ না পাওয়ায় প্রযোজকরা শুটিং শুরু করতে পারছেন না, ফলে কিছু সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রের শিল্পীও হারিয়েছেন।

‘পরোটার স্বাদ’ সিনেমার শিল্পী হারানো

‘পরোটার স্বাদ’ সিনেমার মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর কথা ছিল কংজরী মগের। কিন্তু শুটিংয়ের অপেক্ষায় থেকে থেকে গত ৩১ মার্চ তিনি মারা যান। সিনেমাটি প্রযোজনা ও পরিচালনা করছেন সিংখানু মারমা। তিনি জানান, গত ডিসেম্বরে শুটিংয়ের কথা থাকলেও দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ না পাওয়ায় ছয় মাসেও শুটিং শুরু করতে পারেননি। কংজরী মগ ছিলেন মারমা ভাষায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি, যাকে চরিত্রটির জন্য কাস্ট করা হয়েছিল।

শিশুশিল্পীদের বয়স বেড়ে যাওয়া

কংজরী মগ ছাড়াও সিনেমাটিতে বেশ কয়েকজন শিশুশিল্পী নেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে শুটিং করতে না পারায় চরিত্রের তুলনায় শিশুরা বেড়ে উঠছে, ফলে তাদের নিয়ে কাজ করা দুরূহ হয়ে উঠছে। একই সমস্যা ‘রূহের কাফেলা’ সিনেমার প্রযোজক হাসান আহম্মেদ সানিও জানান। তাঁর সিনেমায় বয়ঃসন্ধিকালের চরিত্র রয়েছে, যারা চরিত্রের চেয়ে বেড়ে উঠছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছয় মাসেও মেলেনি

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অনুদান ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী সরকার। ১১ সেপ্টেম্বর প্রথম কিস্তির ২০ শতাংশ অর্থ পান ১২ প্রযোজক। চুক্তিপত্র অনুযায়ী দ্বিতীয় কিস্তি পাওয়ার জন্য দুই মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করেন আট প্রযোজক। সিনেমাগুলো হলো ‘জলযুদ্ধ’, ‘জীবন অপেরা’, ‘পরোটার স্বাদ’, ‘রবিনহুডের আশ্চর্য অভিযান’, ‘মায়ের ডাক’, ‘রূহের কাফেলা’, ‘নওয়াব ফয়জুন্নেসা’ ও ‘কফিনের ডানা’। ডিসেম্বরে সাত সিনেমা তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হয়। ‘কফিনের ডানা’ এখনো ডাক পায়নি। বাকি চার সিনেমার চুক্তিপত্র দাখিলের কথা ছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডিসেম্বরে চলচ্চিত্র বাছাই ও তত্ত্বাবধান কমিটি জানিয়েছিল, সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ দেওয়া হবে। তবে ছয় মাসেও তা মেলেনি। এর মধ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি সরকার।

প্রযোজকদের চিঠি ও আর্থিক সংকট

গত ২৯ মার্চ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি পাঠান চার প্রযোজক: গোলাম সোহরাব দোদুল (জলযুদ্ধ), আলভী আহমেদ (জীবন অপেরা), সিংখানু মারমা (পরোটার স্বাদ) ও জগন্ময় পাল (রবিনহুডের আশ্চর্য অভিযান)। চিঠিতে বলা হয়, দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ না পাওয়ায় কয়েকজন প্রযোজক শুটিং শুরু করেও স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন। শিল্পীদের অগ্রিম সম্মানী দেওয়া হয়েছে; বারবার শিডিউল পরিবর্তন করলে তাঁরা চুক্তি বাতিল করতে পারেন, ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন প্রযোজকরা।

নির্মাতাদের প্রতিক্রিয়া

‘কফিনের ডানা’ নির্মাতা তানহা জাফরীন বলেন, জুলাইয়ে শুটিংয়ের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু উপস্থাপনের জন্য ডাক না পাওয়ায় শিডিউল বাতিল করে নভেম্বরে শুটিংয়ের পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, ‘কবে নাগাদ অর্থ পাব, জানলেও কাজটা এগিয়ে নিতে পারি।’ সিংখানু মারমা বলেন, ‘ওনারা প্রথম বলেছিল, নির্বাচনের পরে দেবে। পরে বলল, রোজার পরে দেবে। আবার পরে বলল, কোরবানির পরে দেবে। এভাবেই সময়টা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।’ গোলাম সোহরাব দোদুল বলেন, ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে ‘জলযুদ্ধ’ সিনেমার শুটিংয়ের কথা ছিল, কিন্তু অর্থ না পাওয়ায় শুরু করতে পারেননি। ‘মায়ের ডাক’ নির্মাতা লাবিব নাজমুছ ছাকিব বলেন, ফেব্রুয়ারির মধ্যে শুটিং শেষ করতে চেয়েও পারেননি। তিনি বলেন, ‘চুক্তিপত্র অনুযায়ী ১৮ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করে জমা দেওয়ার কথা। এর মধ্যে এক বছর পেরিয়ে গেছে, শুটিংয়ের অর্থই পাইনি।’

অন্যান্য সিনেমার অবস্থা

‘রবিনহুডের আশ্চর্য অভিযান’–এর শুটিং সেপ্টেম্বরে করার কথা, কিন্তু অর্থ না পাওয়ায় শিডিউল পিছিয়ে দিচ্ছেন প্রযোজক জগন্ময় পাল। ‘জীবন অপেরা’ নির্মাতা আলভী আহমেদ অন্য প্রযোজক জোগাড় করে শুটিং করেছেন। ‘খোঁয়ারি’, ‘জুলাই’, ‘কবির মুখ’ ও ‘জুঁই’ সিনেমার প্রযোজকরা চুক্তিপত্র জমা দেননি। ‘খোঁয়ারি’ প্রযোজক সৈয়দ সালেহ আহমেদ বলেন, ‘টাকা পাওয়া না-পাওয়ার চেয়ে বড় কথা, কী হবে, সেটার কোনো গাইডলাইন পাচ্ছি না।’ ‘জুলাই’ প্রযোজক মাহমুদুল ইসলাম বলেন, আগে যারা চুক্তিপত্র জমা দিয়েছে, তারা কেউই দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ পায়নি, ফলে উৎসাহ পাননি।

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের অবস্থা

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেরও অনুদান ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনের আগে আটটি সিনেমাকে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ দেওয়া হয়; নির্বাচনের পর আর কোনো স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমাকে অর্থ দেওয়া হয়নি।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

চলচ্চিত্র বাছাই ও তত্ত্বাবধান কমিটির সদস্য নারগিস আক্তার বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি কিছু বলতে পারছেন না; কমিটি এখনো বহাল আছে কি না, তা–ও তাঁর জানা নেই। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ‘দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিষয়টি যাচাই–বাছাই করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে ইতিমধ্যে বলা হয়েছে। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে করতে হবে।’