শৈশবের স্মৃতি ও প্রথম গান
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমান প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজন ‘অভিজ্ঞতার আলো’য় সাংবাদিক আনিসুল হকের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব, সংগীতজীবন ও বাবা আব্বাসউদ্দীন আহমদের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি খুব ভালো আছি। আপনি এত সুন্দর করে আমাকে ইন্ট্রোডিউস করলেন, আমি জানি না এসব কিছু আমার প্রাপ্য কি না।’
ফেরদৌসী রহমানের জন্ম ১৯৪১ সালে কোচবিহারে, অবিভক্ত বাংলায়। তিন-চার বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে যান। তাঁর শৈশবের স্মৃতি খুব উজ্জ্বল। তিনি বলেন, ‘আমার গান গাওয়ার স্মৃতিটা মনে আছে। দুই বছর কি আড়াই বছর হবে আমার। ঘুম পেলে আমি মায়ের কাছে গিয়ে “আঁখি পাতা ঘুমে জড়ায়ে আসে” গানটা গাইতাম।’
পরিবার ও বাবার প্রভাব
ফেরদৌসী রহমান বিখ্যাত সংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ ও বেগম লুৎফুন্নেসা আব্বাসের কন্যা। তাঁর বড় ভাই সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল এবং আরেক ভাই মুস্তাফা জামান আব্বাসী, যিনি প্রথম আলোর কলাম লেখক ছিলেন। তাঁরাও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফেরদৌসী রহমান বলেন, ‘আব্বা নজরুল ইসলামের অনেক গান গেয়েছেন। “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ” গানটার কথা না করে আপনি থাকতে পারবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আব্বার ক্যারিয়ার কিন্তু আবার শুরু হয়েছে আধুনিক গান দিয়ে। এটা অনেকেই জানেন না। আধুনিক গানের পরের ধাপটা কিন্তু নজরুল সংগীত।’
ঢাকায় আগমন ও শিক্ষাজীবন
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পরিবার ঢাকায় চলে আসে এবং পুরান ঢাকার নারিন্দা, ৭৭ নম্বর ঋষিকেশ দাস রোডে ওঠে। ফেরদৌসী রহমান সেন্ট জেভিয়ার্স কনভেন্টে ভর্তি হন। তিনি বলেন, ‘ওই স্কুলে বই বাড়িতে আনতে দিত না। আব্বাকে বোঝাতে হতো যে হোমওয়ার্ক নেই।’ ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম হন, যা তাঁর বাবার ধারণার বাইরে ছিল।
তিনি বলেন, ‘ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে গেলাম মেয়েদের মধ্যে। আব্বারও এটা ধারণার বাইরে ছিল।’
রেকর্ড ও রেডিওতে প্রথম গান
১৯৫৬ সালে করাচিতে একটি ডেলিগেশনে গিয়ে তিনি প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড করেন। সেখানে কানাইলাল শীলের তত্ত্বাবধানে তিনি দুটি গান শিখেন এবং রেকর্ড করেন। তিনি বলেন, ‘ওখানে আব্বা লিখে দিয়েছিল যে আমার ছেলে–মেয়ে যাচ্ছে আর কানাইলাল শীল যাচ্ছে। ওদের দুটো করে গান যেন রেকর্ড করা হয়।’
রেডিওতে প্রথম গান তিনি গেয়েছিলেন ১৯৫৫ সালে, ১৪ বছর বয়সে। তিনি বলেন, ‘আমার প্রোগ্রাম শুরু হলো ক্ল্যাসিক্যাল আইটেম দিয়ে। তোড়ি রাগে খেয়াল গেয়েছিলাম আমি—ক্ল্যাসিক্যাল।’
বিয়ের পরের জীবন
১৯৬৬ সালের ২৬ অক্টোবর হোটেল শাহবাগে প্রকৌশলী রেজাউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। স্বামী পোস্টগ্র্যাজুয়েশন করতে লন্ডনে গেলে তিনি এক বছর সেখানে ছিলেন। তাঁর দুই ছেলে—রুবাইয়াত ও রাজিন। বড় ছেলে আমেরিকায় এমবিএ করে সেটেল হয়েছেন, ছোট ছেলে লন্ডনে আছেন।
সংগীতের মান ও বর্তমান প্রজন্ম
ফেরদৌসী রহমান মনে করেন, বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠ ভালো, কিন্তু তারা আগের মানের গান পাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আগের সেই আবদুল আহাদ, সমর দাস, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, খান আতা, গাজী মাজহারুল আনোয়ার নেই। আর এই কথার মান যদি ভালো না হয়, তাহলে গানের সুরের মানও তেমন ভালো হয় না।’
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
ফেরদৌসী রহমান স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক ও মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যখনই কোনো পুরস্কার পেয়েছি বা যখনই কোনো রেকগনিশন পেয়েছি, খালি মনে হতো যে আমার আব্বা থাকলে আজকে কত খুশি হতেন।’
তিনি টেলিভিশনে ‘এসো গান শিখি’ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন, যা ঘরে ঘরে জনপ্রিয়তা পায়। তিনি বলেন, ‘শুরুটা আমার কাছে। সেটা আমার একটা বিরাট সৌভাগ্য।’
শৈশবের স্মৃতিতে ফেরা
যদি টাইম মেশিনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান, তিনি কোচবিহারেই যেতে চান। তিনি বলেন, ‘কোচবিহারে যাব। বলরামপুর যাব, আমার দাদার বাড়িতে ওই পুকুরে মাছ ধরব। ওই যে প্রান্তর, গাছপালা, পুকুর, মাছ—এগুলো আমাদেরও খুব টানে।’
সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি বলেন, ‘আজ করে খুব ভালো লাগছে। মনে হয়, আজ ভালো ঘুম হবে।’



