প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেয়েকে নিয়ে দেখলেন 'প্রজেক্ট হেইল মেরি'
শুক্রবার রাতে মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে ঢাকার একটি মাল্টিপ্লেক্সে হলিউড সিনেমা 'প্রজেক্ট হেইল মেরি' দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছুটির দিনে সাধারণ দর্শকের মতো সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার এই ঘটনা নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান। তিনি সাংবাদিকদের জানান, বিনোদনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী প্রেক্ষাগৃহে ছবি দেখতে এসেছিলেন। সন্ধ্যা সাতটা দশ মিনিটে শুরু হয়ে রাত দশটা দশ মিনিটে শেষ হয়েছে শোটি।
সামাজিক মাধ্যমের আলোচনা
প্রধানমন্ত্রীর এমন উপস্থিতির খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিন পর দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো ব্যক্তিত্বকে এভাবে পরিবারের সঙ্গে সাধারণ দর্শকের মতো সিনেমা উপভোগ করতে দেখা গেল। এটি একদিকে যেমন ভিন্নধর্মী বার্তা দেয়, তেমনি সিনেমা হল সংস্কৃতির প্রতিও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত বহন করে।
'প্রজেক্ট হেইল মেরি'র বিশ্বব্যাপী সাফল্য
আলোচনার আরেকটি বড় কারণ সিনেমাটি নিজেই। 'প্রজেক্ট হাইল মেরি' মুক্তির পর থেকেই বিশ্বজুড়ে বক্স অফিসে দারুণ সাফল্য পাচ্ছে, পাশাপাশি সমালোচকদের কাছ থেকেও মিলছে প্রশংসা। বিজ্ঞাননির্ভর কাহিনি, মহাকাশ অভিযানের রোমাঞ্চ আর মানবিক আবেগ—সব মিলিয়ে সিনেমাটি দর্শকদের জন্য হয়ে উঠেছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
নেটিজনদের মধ্যেও ঘুরপাক খাচ্ছে—কী এমন আছে এ সিনেমায়, যা একদিকে বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছে, অন্যদিকে দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও টেনে নিয়েছে প্রেক্ষাগৃহে? সেই কৌতূহল থেকেই অনেকেই এখন খোঁজ নিচ্ছেন ছবিটি দেখার, বাড়ছে মাল্টিপ্লেক্সে দর্শক উপস্থিতিও।
বক্স অফিস রেকর্ড
মুক্তির পরই বিশ্বজুড়ে ১৪০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার আয় করে ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় ওপেনিংয়ের রেকর্ড গড়েছে 'প্রজেক্ট হেইল মেরি'। সর্বশেষ সপ্তাহান্তে আরও ৫৪ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার আয় করে ছবিটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৩০০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারে। ২০২২ সালে অ্যামাজনের এমজিএম অধিগ্রহণের পর এটি তাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ছবিটি যুক্তরাজ্য, চীন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিসহ বিভিন্ন বাজারে দারুণ ব্যবসা করছে। ২০ মার্চ মুক্তির পরই সিনেমাটি ছাড়িয়ে গেছে 'স্ক্রিম ৭'-কে, যেটি ছিল এ বছরের আগের সবচেয়ে বড় ওপেনিং। প্রযোজনা সংস্থা অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওজের জন্যও এটি বড় এক সাফল্য, বিশেষ করে ৮ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে এমজিএম অধিগ্রহণের পর এটি তাদের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক হিট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিনেমার গল্প ও নির্মাতা
সায়েন্স ফিকশন সিনেমাটির কেন্দ্রে আছেন রায়ান গসলিং, যিনি সাধারণ এক বিজ্ঞানশিক্ষক থেকে মানবজাতিকে রক্ষার দায়িত্ব নেওয়া নায়ক হয়ে ওঠেন। হঠাৎ করেই এক মহাকাশ মিশনে জড়িয়ে পড়েন তিনি, পৃথিবীকে এক ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা যাঁর লক্ষ্য। অ্যান্ডি উইয়ারের উপন্যাস থেকে গল্পটি তৈরি হয়েছে। তাঁর আগের বই অবলম্বনে তৈরি 'দ্য মার্শিয়ান' সিনেমাটিও প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
ছবিটি পরিচালনা করেছেন ফিল লর্ড ও ক্রিস্টোফার মিলার, যাঁরা এর আগে '২১ জাম্প স্ট্রিট', 'দ্য লেগো মুভি'র মতো জনপ্রিয় কাজ করেছেন। তাঁদের হাত ধরে 'প্রজেক্ট হেইল মেরি' হয়ে উঠেছে ভিজ্যুয়ালি আকর্ষণীয় ও আবেগঘন এক মহাকাশ অভিযান।
সমালোচকদের মতামত
সিনেমাটি নিয়ে সমালোচকদের মত মিশ্র। কেউ বলছেন, এটি 'চিন্তাকে প্রসারিত করা সায়েন্স ফিকশন', যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপভোগ্য। আবার কেউ মনে করছেন, গল্পে কিছুটা পরিচিত ছক রয়েছে, এমনকি ক্রিস্টোফার নোলানের 'ইন্টারস্টেলার'-এর ছায়াও পাওয়া যায়। তবে প্রায় সবাই একমত, গসলিংয়ের অভিনয়ই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি।
গসলিং নিজেই জানিয়েছেন, এ ছবিতে কাজ করার অন্যতম কারণ ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক গল্পের সঙ্গে হাস্যরসের মিশ্রণ। তাঁর মতে, কঠিন বৈজ্ঞানিক কাহিনিকে সহজ করে তুলতে এই উপাদান গুরুত্বপূর্ণ। করোনা-পরবর্তী সময়ে সিকুয়েল ছাড়া নতুন গল্পের সিনেমাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বড় সাফল্য। 'ওপেনহেইমার', 'এফ১'-এর পাশে জায়গা করে নিয়েছে 'প্রজেক্ট হেইল মেরি'।
সমালোচকেরা বলছেন, রায়ান গসলিং তাঁর স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ে এই চরিত্রকে একসঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত, হাস্যরসাত্মক ও আবেগপূর্ণ করে তুলেছেন।
বন্ধুত্বের গল্প
এ ছবির সবচেয়ে বড় চমক আসে 'রকি' চরিত্রে—এক ভিনগ্রহের প্রকৌশলী। দেখতে অদ্ভুত, ভাষা সম্পূর্ণ অজানা, তবু লক্ষ্য একটাই—নিজেদের সভ্যতাকে বাঁচানো। রাইল্যান্ড ও রকির মধ্যে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এক অসাধারণ বন্ধুত্ব। ভাষা, সংস্কৃতি, গ্রহ—সব বাধা পেরিয়ে তারা একে অপরকে বুঝতে শেখে। এ সম্পর্কই সিনেমার প্রাণ।
এখানে বিজ্ঞান কেবল প্রেক্ষাপট; আসল গল্প মানবিকতার। নির্মাতারা বুঝেছেন—সব দর্শক সমীকরণ বোঝেন না, কিন্তু অনুভূতি বোঝেন। তাই জটিল বিজ্ঞানের মধ্যেও গল্পের আবেগ কখনো হারিয়ে যায় না। গভীর সংকটের মধ্যেও ছবিটি আশ্চর্য রকম হালকা ও রসাত্মক। রাইল্যান্ডের সংলাপ, উদ্ভট পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে অনেক মুহূর্তেই হাসি আসে।
তবে সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—সাহস মানে সব সময় বড় কোনো বীরত্ব নয়, কখনো কখনো তা কেবল অন্য কারও পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। আজকের পৃথিবীতে, যেখানে যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট আর অনিশ্চয়তা প্রতিদিনের বাস্তবতা, সেখানে 'প্রজেক্ট হেইল মেরি' এক ভিন্ন সুর তোলে। এটি বলে, হয়তো শেষ পর্যন্ত আমাদের বাঁচাবে প্রযুক্তি নয়; বরং পারস্পরিক সহমর্মিতা।



