চার বছর পর পুরোদমে ফিরল বিটিএস, নতুন অ্যালবাম ও বিশ্ব সফর
চার বছর পর পুরোদমে ফিরল বিটিএস, নতুন অ্যালবাম ও বিশ্ব সফর

চার বছর পর পুরোদমে ফিরল বিটিএস

কনসার্টে বিটিএস। ছবি: এএফপি। চার বছর! চার বছরে বদলে গেছে অনেক কিছু। তবে রয়ে গেছে প্রতীক্ষা। আর্মিরা গুনেছে দিন, মাস, বছর। একটাই প্রশ্ন, কবে ফিরবে বিটিএস? অবশেষে তবে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল! পুরোদমে ফিরে এল বিটিএস! প্রায় চার বছরের বিরতির পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় বয়ব্যান্ড হাজির হলো নতুন অ্যালবাম, ওয়ার্ল্ড ট্যুর আর সেই সঙ্গে নিজেদের ডকুমেন্টারি নিয়ে। অর্থাৎ বিটিএসের সেই সাত সদস্য—আরএম, জিন, সুগা, জে-হপ, জিমিন, ভি আর জাংকুক—সাতজন আবার একসঙ্গে, একই মঞ্চে।

সামরিক সেবা থেকে মঞ্চে

বিটিএসের এই হঠাৎ বিরতির পেছনে ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার ১৮-২১ মাসের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে প্রথম সদস্য হিসেবে সামরিক সেবায় যোগ দেন জিন। এরপর একে একে বাকিরাও হাঁটেন সেই পথে। র‌্যাপার জে-হপ যোগ দেন ২০২৩ সালের এপ্রিলে। এর পাঁচ মাসের মাথায় আরেক র‌্যাপার সুগাও যোগ দেন সামরিক সেবায়। দলপতি আরএম এবং আরেক সদস্য ভি যোগ দেন ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, তার ঠিক এক দিনের মাথায় সবশেষে জিমিন ও জাংকুকও একই সঙ্গে যোগ দিয়েছেন সেই সেবায়। দুই বছরের মাথায় সাতজনই নিজ নিজ সেবা সম্পন্ন করে ফিরে এসেছেন ইতিমধ্যে। এর মাঝে বয়োজ্যেষ্ঠ জিন ফিরেছেন সবার আগে, ২০২৪ সালের জুনে, তারপর একে একে বাকিরাও। এর পর থেকেই পুরো দল আবার লেগে পড়েছে সংগীতের জগৎ মাতানোর প্রস্তুতিতে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘আরিরাং’—এক অসাধারণ ফেরা

বিটিএস এবার ফিরে এল নতুন অ্যালবামের মাধ্যমে। চলতি বছরের ২০ মার্চ মুক্তি পায় বিটিএসের পঞ্চম স্টুডিও অ্যালবাম ‘আরিরাং’। প্রায় ছয় বছর পর মুক্তি পেল ব্যান্ডটির প্রথম স্টুডিও অ্যালবাম। নামটা নিছক কাকতালীয় নয়। আরিরাং হলো কোরিয়ার একটি ঐতিহ্যবাহী লোকগান, যা দেশটির সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নতুন অ্যালবাম নিয়ে বিগ হিট মিউজিক জানিয়েছে, এই অ্যালবামটি বিটিএসের পরিচয়কে এমন একটি দল হিসেবে ধারণ করে, যে দলের সদস্যরা দক্ষিণ কোরিয়ার ছোট্ট সব শহর থেকে উঠে এসেছে। মোট ১৪টি ট্র্যাক রয়েছে অ্যালবামে। বিটিএসের সঙ্গে এই অ্যালবামে ডিপ্লো, কেভিন পার্কার ও রায়ান টেডারের মতো বিশ্বখ্যাত প্রযোজকরা কাজ করেছেন। আর ফলাফল? ঠিক সব সময়ের মতোই আবারও বিটিএসের বাজিমাত। প্রথম সপ্তাহেই ‘আরিরাং’ অ্যালবামটি বিক্রি হয়েছে ৪২ লাখ কপি। সেই সঙ্গে স্পটিফাইয়ে প্রথম দিনেই ১১ কোটি স্ট্রিম এবং ইউএস বিল বোর্ড ২০০-তে সরাসরি এক নম্বরে জায়গা পায় অ্যালবামটি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আরিরাং: ট্র্যাকলিস্ট ও বিস্তারিত

প্রায় চার বছর ধরে ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা, সামরিক সেবা এবং একাকিত্ব, এমন সব অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২৫ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে একত্রিত হন বিটিএসের সাত সদস্য। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘আরিরাং’—প্রায় ৬০০ বছর পুরোনো কোরিয়ান লোকসংগীত থেকে অনুপ্রাণিত ১৪টি ট্র্যাকের এই অ্যালবাম। অ্যালবামটির প্রযোজনায় ছিলেন ডিপ্লো, রায়ান টেডার, মাইক উইল মেড-ইট, কেভিন পার্কার, ফ্লুম, এল গুইঞ্চো এবং দীর্ঘদিনের সহযোগী পিডগ। সেই সঙ্গে দলনেতা আরএমের হাত ছিল প্রায় প্রতিটি ট্র্যাকে। এই অ্যালবামে টাইটেল ট্র্যাক হিসেবে আছে ‘সুইম’, যা ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

সিউলের রাস্তায় আবারও বিটিএসের ইতিহাস রচনা

২১ মার্চ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের ঐতিহাসিক গুয়াংহওয়ামুন স্কয়ার-এ অনুষ্ঠিত হয় ‘বিটিএস কামব্যাক লাইভ- আরিরাং’ কনসার্টটি। গুয়াংহওয়ামুন স্কয়ার দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল শহরে ঐতিহাসিক গিয়ংবকগুং প্রাসাদের ঠিক সামনে অবস্থিত। জনসমাগমের জন্য দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত স্থান এটি। সেই গুয়াংহওয়ামুন স্কয়ারেই ইতিহাস গড়ে নিজেদের নতুন অধ্যায়ের শুরু করল বিটিএস। কনসার্টটি মূল ভেন্যুর পাশাপাশি সরাসরি সম্প্রচার করেছে নেটফ্লিক্স। সিউলের গিয়াংওয়ামুন স্কয়ারের মূল ভেন্যু এবং এর আশপাশে প্রায় এক লাখ চার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিলেন কনসার্টটি উপভোগ করতে। এর মাঝে মূল অনুষ্ঠানস্থলে ছিলেন ২২ হাজার মানুষ। বাকিরা কনসার্ট উপভোগ করেন রাস্তার বড় স্ক্রিনের ডিজিটাল বিলবোর্ডে। এ ছাড়া নেটফ্লিক্সে ১৯০টি দেশ থেকে প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ দর্শক বিশ্বজুড়ে সরাসরি উপভোগ করেন কনসার্টটি। আর এর মাধ্যমেই আবারও ইতিহাস গড়ল বিটিএস। বলা হচ্ছে, ‘বিটিএস কামব্যাক লাইভ-আরিরাং’ কনসার্টটি দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পাবলিক কনসার্ট।

এবার তাহলে কিসের পালা

বিটিএস শুধু ফিরে আসেনি, তারা ফিরে এসেছে নতুন সব চমক নিয়ে। ফলে এই যাত্রা তো কেবল শুরু। চলতি বছরের ৯ এপ্রিল শুরু হতে হচ্ছে বিটিএসের বহুল প্রতীক্ষিত ‘আরিরাং’ ওয়ার্ল্ড ট্যুর। বিশ্বের ২৩টি দেশের ৩৪টি শহরে ৮২টি কনসার্টের মাধ্যমে বিশাল এক মাইলফলক স্থাপন করতে যাচ্ছে এই ট্যুর। সব সময়ের মতোই টিকিট বিক্রি শুরুর মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায় প্রায় সব শো ‘সোল্ড আউট’ হয়ে গিয়েছিল। আধুনিক হলোগ্রাম প্রযুক্তি এবং ড্রোন শোর সমন্বয়ে সাজানো এই ট্যুরে বিটিএস সদস্যরা তাঁদের নতুন অ্যালবাম ‘আরিরাং’-এর গানগুলো পারফর্ম করবেন। দক্ষিণ কোরিয়ার ঐতিহ্য ও আধুনিক পপ মিউজিকের এক অনন্য ফিউশন হিসেবে ইতিমধ্যে ব্যাপক আলোচিত অ্যালবামটি।

বিটিএস তারকা জিমিন

ছবি: বিগহিট মিউজিক। ছোট্ট একটা স্বপ্ন থেকে বিশ্বজয়। ২০১৩ সালে বিটিএসের সাতজন স্বপ্নবাজ কিশোরের সামনে ছিল শুধু একটা মাইক। সে বছর ১৩ জুন ‘নো মোর ড্রিম’ গান দিয়ে অভিষেক ঘটে বিটিএসের। সেই গানের বিষয়বস্তু ছিল সামাজিক চাপ, পরীক্ষার ভার, স্বপ্নের অপমৃত্যু—মানে কিশোর মনের না বলা যত কথা। তবে প্রথম বছরগুলো তাঁদের জন্য সহজ ছিল না একেবারেই। অনেকে বলেছে, এই ব্যান্ড এক বছরেই হারিয়ে যাবে। তাই বলে বিটিএস থামেনি। ২০১৬ সালে ‘উইংস’ অ্যালবামের মাধ্যমে ইতিহাস রচনার শুরু এই ব্যান্ডটির। ব্যাপক সাড়ার পরপরই আসে তাদের আরেক বিশ্বখ্যাত অ্যালবাম ‘লাভ ইয়োরসেলফ’। এই অ্যালবামের মাধ্যমে বিটিএস হয়ে ওঠে বিশ্বখ্যাত পপ ব্যান্ড। ২০২০ সালের আগস্টে মুক্তি পায় তাঁদের একক গান ‘ডায়নামাইট’। করোনা মহামারির মধ্যেই গানটি কাঁপিয়ে দেয় পুরো বিশ্বকে। এটিই ছিল বিলবোর্ড হট ১০০-তে সরাসরি ১ নম্বরে ওঠা তাদের প্রথম গান। ২০২১ সালে আবার বাজিমাত। মুক্তি পায় ‘বাটার’। চার্টে টানা ১০ সপ্তাহ শীর্ষে ছিল গানটি। ২০২২ এবং ২০২৩ টানা দুই বছরই বিটিএস পায় গ্র্যামির নমিনেশন। এ ছাড়া ২০১৬ থেকে ২০২২—টানা সাত বছর জেতে কেপপ জগতের অন্যতম মামা অ্যাওয়ার্ড শো ‘আর্টিস্ট অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার, কে-পপ ইতিহাসে যা ছিল অসাধ্য। হুট করেই নেমে আসে দুঃসংবাদ। ১৩ জুন ২০২২-এ ছিল বিটিএসের নবম জন্মবার্ষিকী। সেদিনই ঘোষণা আসে একটি বিরতির। সেই ঘোষণায় শুধু বিটিএস সদস্যরাই কাঁদেননি, তাঁদের সঙ্গে কেঁদেছেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বিটিএস আর্মি। তবে ব্যান্ডটি কথা দিয়েছিল ভক্তদের। বলেছিল, এটিই শেষ নয়, আরও দারুণ কিছু নিয়ে তাঁরা ফিরে আসবেন আর্মিদের মাঝে, খুব শিগগির। বিটিএস কথা রেখেছে, ফিরে এসেছে নতুন উদ্যমে। এখন দেখার পালা আর কী কী চমক অপেক্ষা করছে আর্মি তথা গোটা সংগীত অঙ্গনের জন্য। সূত্র: রোলিং স্টোন, টুডুম বাই নেটফ্লিক্স, সিএনএন, দ্য কোরিয়া টাইমস।