বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ করেছে সিনেমা প্রদর্শন, গানের আয়োজন ও তার কর্মময় জীবনের ওপর আলোচনার মধ্য দিয়ে। শুক্রবার (৫ জুন) সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে মনিষীদের স্মরণমালা অনুষ্ঠানমালার শেষ আয়োজন ছিল ‘হুমায়ূন স্মরণ’।
নুহাশ হুমায়ূনের অনুভূতি
অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বড় ছেলে নুহাশ হুমায়ূন বলেন, বাবার জন্ম বা মৃত্যু দিবস ছাড়াই আলোচনা হচ্ছে। এটা আমাকে ভীষণ আনন্দ দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, এখানে আসার আগে একজনকে দেখলাম বৃষ্টিতে ভিজে এসে পঞ্চমবারের মতো ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্র দেখলেন এবং আমার সঙ্গে শেয়ার করলেন। এটাই প্রমাণ করে, বাবাকে মানুষ পরিবারের সদস্য হিসেবে নিয়েছে।
পিতা হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে নুহাশ বলেন, বাবা আমাদের নিয়ে এত লিখেছেন। মানুষ আমাদেরকে তার গল্পের চরিত্রই মনে করে। ফলে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহ দেখান, ভালোবাসেন। পৃথিবীর যত দেশে গিয়েছি দেখেছি বাবাকে নিয়ে আলোচনা হয়। সন্তান হিসেবে আমার এ এক অন্যরকম অনুভূতি, বলে বোঝানোর মতো নয়।
নুহাশের ভাষ্য, একজন ক্রিয়েটিভ মানুষকে যে কত পরিশ্রমী এবং সিরিয়াস হতে হয় তা খুব অল্প বয়সে বাবাকে দেখে বুঝেছি। এ সময় নুহাশ তার নির্মিত সিনেমা ‘ম্যুভিং বাংলাদেশ’র খবর দেন এবং সকলের শুভ কামনা প্রত্যাশা করেন।
গবেষক ও নির্মাতাদের বক্তব্য
‘হুমায়ুন আহমেদ: নির্মাণশৈলি ও শিল্প দর্শন’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠে চলচ্চিত্র গবেষক ড. শাহাদৎ রুমন বলেন, হুমায়ূন আহমেদ একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী হিসেবে মধ্যবিত্ত পরিবারের ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তিনি হাস্যরস, ব্যঙ্গ ও দর্শনের সমাহার ঘটান। তার নির্মিত ছবিগুলো সমাজে পূর্ণরূপে পাওয়া যায় না, তবে মানুষের ভেতরের গল্পগুলো তিনি তুলে ধরেছেন।
ড. শাহাদৎ রুমনের মতে, হুমায়ূন আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে হালকাভাবে উপস্থাপন করেছেন, আবার হালকা ঘটনাকে বড় করে উপস্থাপন করেছেন।
চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিক্ষক অধ্যাপক ড. মতিন রহমান বলেন, চলচ্চিত্র সংকট ও কঠিন সময়ে হুমায়ূন আহমেদ সিনেমা নিয়ে আসলেন এবং জয় করলেন। কিন্তু তার দুর্নামটা যাচ্ছিল না। তার কানে আসতো, তার সিনেমা সিনেমা নয় নাটক হয়ে যাচ্ছে। এতে হুমায়ূন আহমেদ থামলেন না বরং একের পর এক সফল সিনেমা বানালেন।
মতিন রহমানের ভাষ্য, হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি স্বতন্ত্র; কী নির্মাণে, কী সংলাপে। তার সবকিছুই ছিল জীবন্ত, প্রকৃতির সৃষ্ট কিছুর বাইরে অতিরিক্ত তিনি সিনেমায় আনতেন না। হুমায়ূন আহমেদ সব সময় সাহিত্যে ও সিনেমায় মানুষের কথা বলেছেন যা প্রকৃত শিল্পীর কাজ। একই সঙ্গে লোকজ সংস্কৃতি ও লোকায়ত জীবনকে প্রাণবন্ত করেছেন তার সৃষ্টিতে।
শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের বক্তব্য
সভাপতির বক্তব্যে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, হুমায়ূন আহমেদ রসিক মানুষ ছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন সৃজনশীলতা দিয়ে আয় করা যায়। অর্থাৎ হুমায়ূন আহমেদ ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. মিজানুর রহমান।
সাংস্কৃতিক আয়োজন
এর আগে বিকাল ৪ টায় ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমার প্রদর্শন হয়। পরে শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন সিনেমার গান যেমন- ‘যদি মন কাঁদে’, ‘কে আইসা দাঁড়াইছে গো’, ‘আমার ভাঙা ঘরে’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ’, ‘বরষার প্রথম দিনে’, ‘আমার আছে জল’, ‘দুঃখটুকু দিলাম ছুটি’, ‘মানুষের ভেতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন’, ‘মরিলে কান্দিসনা আমার দায়’ গান পরিবেশন করে।
এরপর আলোচনা শেষে হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ এবং হুমায়ূনকে নিয়ে চলচ্চিত্র ‘হুমায়ূন সাগরে কিছুক্ষণ’ দেখানো হয়।



