দ্য ডেইলি স্টার–এর ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অতিথিরা যখন এর কার্যালয়ে প্রবেশ করলেন, তখন তাঁরা কোনো ঝকঝকে অন্দরসজ্জা বা পালিশ করা লবি দেখতে পাননি। বরং তাঁরা পা রাখেন আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত একটি ভবনের কঙ্কালসার ধ্বংসাবশেষে। পোড়া দেয়াল এবং উঠে যাওয়া রঙের ওপর স্পটলাইটের আলো পড়ছিল। মেঝেতে ভাঙা টাইলসের ওপর অতিথিদের পদচারণে উড়ছিল ছাই, যা চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল। হাঁটার পথের দুই পাশে পড়ে ছিল পোড়া সংবাদপত্রের স্তূপ আর জানালার কাচের টুকরা। গ্রীষ্মের গরমে সেই আধপোড়া কাঠের কাঠামোগুলো যেন তেতে উঠছিল।
প্রদর্শনী নয়, বাস্তবতার প্রতিফলন
সেখানে প্রদর্শিত হওয়া দৃশ্যগুলো কোনো প্রদর্শনী ছিল না; বরং তা ছিল ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বরের রাতের সেই হামলার এক নির্মম ও রূঢ় প্রতিফলন। যে হামলা থেকে পত্রিকার ২৯ জন সংবাদকর্মী বেঁচে ফিরেছিলেন এবং অতিথিরা যা তাঁদের টেলিভিশনের পর্দায় ঘটতে দেখেছিলেন। ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে নিজস্ব কার্যালয়ে ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করে। পত্রিকাটি যখন এর সাংবাদিকতার সাড়ে তিন দশক উদযাপন করছিল, তখন অনুষ্ঠানটি এ বার্তারই এক স্মারক হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে উচ্ছৃঙ্খল জনতা ভবন পুড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু ‘নির্ভীক ও নিরপেক্ষ’ সাংবাদিকতার যে আদর্শ, তা দমন করতে পারে না।
অনুষ্ঠানের সূচনা ও স্মরণ
জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩তম বার্ষিকী, মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সম্পাদকের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে দ্য ডেইলি স্টার–এর সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘যখন একটি মুক্ত গণমাধ্যমকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন তার সঙ্গে গণতন্ত্রও পুড়ে যায়।’ তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, সংবাদমাধ্যম যখন নীরব হয়ে যায়, তখন গণতন্ত্র হোঁচট খায়। মাহফুজ আনাম শ্রোতাদের স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৯১ সালের ১৪ জানুয়ারি জেনারেল এইচ এম এরশাদের স্বৈরাচারের পতনের সময় পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সম্মাননা প্রদান
অনুষ্ঠানে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বরের সেই ভয়াবহ রাতে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ডেইলি স্টার–এর কর্মীদের প্রাণ বাঁচাতে এগিয়ে আসায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং সেনাবাহিনীকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন আইএসপিআরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জুননুন নাহিদ। তাঁরা অনুপস্থিত থাকলেও তাঁদের নামে এই স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। এ ছাড়া সম্মান জানানো হয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কাজী নাজমুজ্জামান, তেজগাঁও ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. নাজিম উদ্দিন সরকার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (তেজগাঁও বিভাগ) মোহাম্মদ ইবনে মিজান এবং তেজগাঁও থানার ওসি ক্যা সুই নু মারমাকে।
তৃণমূলের উদ্যোক্তাদের সম্মান
অনুষ্ঠানে তৃণমূল পর্যায়ে পরিবর্তন আনা চারজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানানো হয়। তাঁরা হলেন চুয়াডাঙ্গার তৃণমূল স্বাস্থ্যকর্মী রহিমা খাতুন, যশোরের কৃষি উদ্যোক্তা বিল্লাল হোসেন, দ্রুততম মানবী শিরিন আক্তার ও ঠাকুরগাঁওয়ের নিজ গ্রামে মোজারেলা চিজ তৈরির বিপ্লব ঘটানো নাগিনা নাজনীন বানু।
অতিথিবৃন্দ
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হক। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন, মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান এবং শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর এবং পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজ, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী, কাউন্টারপয়েন্ট-এর সম্পাদক জাফর সোবহান, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া এবং সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান। অনুষ্ঠানে ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহনাজ রহমান এবং ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমানও উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ, উপাচার্য, সাংবাদিক, কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজের সদস্য এবং পত্রিকার শুভানুধ্যায়ীসহ কয়েক শ অতিথি উপস্থিত ছিলেন।



