কুষ্টিয়ায় ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে বড় ভাই নিহত, মায়ের আহাজারিতে শোকাচ্ছন্ন পরিবার
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় পারিবারিক কলহের জেরে এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ছোট ভাইয়ের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে বড় ভাই নিহত হওয়ার পর থেকে পরিবারটি শোকের ছায়ায় নিমজ্জিত। নিহতের মা সবুরা খাতুনের আহাজারি ও স্ত্রীর বেদনাবিধুর বর্ণনায় ঘটনার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
গত সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে বারোটার দিকে কুমারখালী উপজেলার বানিয়াপাড়া বাড়াদী এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। নিহত রাশেদ শেখ (৩০) কয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও পেশায় ফেরিওয়ালা ছিলেন। তিনি বরিশালে ফেরি করে মশারি বিক্রি করতেন। রাতে বাড়ি ফেরার পর বারান্দায় বসে মোবাইলে ভিডিও দেখছিলেন।
এ সময় হঠাৎ তাঁর ছোট ভাই জহুরুল ইসলাম (২৪) ধারালো ছুরি নিয়ে ঘাড়, পেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। জহুরুল ঘটনার পরপরই ঘরে তালা লাগিয়ে দ্রুত পালিয়ে যান। প্রতিবেশী ও স্বজনেরা রাশেদকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
মায়ের বেদনাদায়ক অভিব্যক্তি
মঙ্গলবার দুপুরে রাশেদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের মৃত্যুর শোকে মা সবুরা খাতুন আহাজারি করছেন। স্বজনেরা তাঁকে ঘিরে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমার কেউ রইল না। আমি কী নিয়ে থাকবনে? আমি বাড়ি ছিলাম না। বড় মেয়ের বাসায় গিছিলাম। রাতে শুনলাম, বড় ছেলে আর নেই। শুনেই চলে আসছি। ছোট ছেলে অনেক দিন ধরে মানসিক রোগী। কী বিচার চাব? কার বিচার চাব?’
স্ত্রীর মর্মস্পর্শী বর্ণনা
রাশেদের স্ত্রী লাকী খাতুন ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘ও বারান্দায় বসে মোবাইলে ভিডিও দেখছিল। আর আমি ওয়াশরুমে গিছিলাম। ওয়াশরুমে যাবার পরপরই একটা শব্দ শুনি। বাইরে এসে দেখি জহুরুল ওকে কোপাচ্ছে। আমি কাছে আসতেই ও দৌড়ে চলে যায়। তখন আমি সগলের ডাকেডুকে হাসপাতালে নিলে ডাক্তার বলে মরে গেছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘জহুরুলের সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না। ও কাজ করে না, শুধু নেশা করত। গত ঈদে পাঁচ হাজার টাকা চাইছিল। কিন্তু দিছিলাম না। সেই রাগ ও এত দিন পুষে রাখবে ভাবিনি। আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।’
অভিযুক্তের পরিবারের প্রতিক্রিয়া
জহুরুলের স্ত্রী আলো খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী কাজকাম করে না। নেশা করত। বারবার টাকা চাইত। কী জন্য হত্যা করল, তা জানি না। তবে যে অপরাধী, তার বিচার হোক।’ তাঁর বক্তব্যে পরিবারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
চিকিৎসা ও পুলিশি তদন্ত
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হোসেন ইমাম জানান, হাসপাতালে আসার আগেই রাশেদের মৃত্যু হয়। তাঁর শরীরের একাধিক স্থানে গভীর ক্ষত রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ধরা গেলে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। এ ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং পলাতক জহুরুলকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ও শোক
স্থানীয় বাসিন্দারা এ হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা পারিবারিক সহিংসতা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। রাশেদ শেখের মৃত্যুতে এলাকাটি শোকের মাতমে মূর্তিমান হয়ে উঠেছে, যেখানে একটি সাধারণ পারিবারিক বিরোধ ভয়াবহ পরিণতির দিকে মোড় নিয়েছে।



