যুক্তরাজ্যের টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চার প্রার্থীর মেয়র পদে লড়াই
যুক্তরাজ্যের আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি–অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে মেয়র পদে লড়ছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চার প্রার্থী। এই প্রার্থীরা হলেন অ্যাসপায়ার পার্টির বর্তমান মেয়র লুৎফুর রহমান, লেবার পার্টির কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম, টাওয়ার হ্যামলেটস ইনডিপেনডেন্টসের প্রার্থী জামি আলী ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টির (লিব ডেমস) মোহাম্মদ আবদুল হান্নান। আগামী ৭ মে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অন্যান্য প্রার্থী
এ নির্বাচনে মেয়র পদে আরও লড়ছেন কনজারভেটিভ পার্টির ডমিনিক নোলান, গ্রিন পার্টির হীরা খান, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট অ্যান্ড স্যোশালিস্ট কোয়ালিশনের হুগো পিয়েরে, রিফর্ম ইউকের জন বোলার্ড ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্যারেন্স ম্যাকগ্রেনেরা। তবে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, লুৎফুর রহমানের সঙ্গে সিরাজুল ইসলামের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে, ফলে এই কাউন্সিলের নেতৃত্ব বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কোনো রাজনীতিকের হাতে থাকার সম্ভাবনা জোরালো। টাওয়ার হ্যামলেটস দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক প্রভাবের একটি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, এবং এই বরোর দুটি পার্লামেন্টারি আসনে রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি রুশনারা আলী ও আপসানা বেগম।
লুৎফুর রহমান: অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের তিনবারের নির্বাচিত নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বাংলাদেশের সিলেট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং শৈশবে যুক্তরাজ্যে অভিবাসী হন। আইন পেশায় সলিসিটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে তিনি কমিউনিটি রাজনীতির মাধ্যমে দ্রুত স্থানীয় পর্যায়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ২০১০ সালে প্রথম সরাসরি নির্বাচিত মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন, কিন্তু ২০১৫ সালে নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে আদালতের রায়ে তাঁর মেয়র পদ বাতিল হয় এবং পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচনে নিষিদ্ধ হন। ২০২২ সালে অ্যাসপায়ার পার্টির মনোনয়নে মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেন। সম্প্রতি, কেন্দ্রীয় সরকারের তদারকি জোরদার হওয়ায় কাউন্সিলের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। লুৎফুর রহমান দাবি করেন, গত নির্বাচনের আগে তাঁর দেওয়া প্রায় ১২০টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে ৯৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে, এবং তাঁর নির্বাচনী স্লোগান হলো ‘উন্নয়ন বাস্তবায়ন ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অ্যাসপায়ারকে ভোট দিন’।
সিরাজুল ইসলাম: দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও হাউজিং পরিকল্পনা
২০০১ সাল থেকে টানা সাতবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম এবারের নির্বাচনে লেবার পার্টির মনোনয়নে মেয়র পদে লড়ছেন। ১৯৭২ সালে যুক্তরাজ্যে আসা সিরাজুল ইসলাম পূর্ব লন্ডনে বেড়ে ওঠেন এবং দরজির কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্ণবাদী অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বৈষম্য তাঁকে রাজনীতিতে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৯০–এর দশকে লেবার পার্টির মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়, এবং তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। মেয়র নির্বাচিত হলে পাঁচ হাজার নতুন ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর, এবং তিনি হাউজিং খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেবেন বলে জানিয়েছেন।
জামি আলী: আইন পেশা ও স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি
টাওয়ার হ্যামলেটস ইনডিপেনডেন্টসের প্রার্থী জামি আলী আইন পেশাসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে জন্ম নেওয়া জামি আলী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং যুক্তরাজ্যে বার-এ কল গ্রহণ করে লন্ডনে আইনচর্চা শুরু করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে আইন কর্মকর্তা হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। নির্বাচিত হলে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে কাউন্সিলের ব্যয়ের স্বাধীন অডিট, হাউজিং খাতে স্বচ্ছতা ও জনসেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
মোহাম্মদ আবদুল হান্নান: উদ্যোক্তা ও সেবার অগ্রাধিকার
লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টি থেকে মেয়র পদে প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল হান্নান ১৯৯৫ সালে যুক্তরাজ্যে অভিবাসী হয়ে আসেন এবং একজন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তিনি ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যের মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং বর্তমানে ক্যানারি ওয়ার্ফে নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করছেন। নির্বাচিত হলে তিনি আবাসনসংকট মোকাবিলা, সড়ক নিরাপত্তাসহ পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করবেন, এবং কাউন্সিলের সেবায় জবাবদিহিকে অগ্রাধিকার দেবেন বলে জানিয়েছেন। আবদুল হান্নান আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রবীণদের জন্য গণপরিবহন আরও সহজে প্রবেশযোগ্য করতে কাজ করার।
এই নির্বাচন টাওয়ার হ্যামলেটসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও প্রভাব বৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



