ফ্লোরিডায় নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থী: রক্তের দাগ ও সন্দেহজনক আচরণ
ফ্লোরিডায় নিখোঁজ শিক্ষার্থী: রক্তের দাগ ও সন্দেহ

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির ঘটনায় নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। সাউথ ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির (ইউএসএফ) পুলিশ ও হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের গোয়েন্দারা তদন্তে নেমে সন্দেহজনক আচরণ ও রক্তের দাগ পেয়েছেন।

নিখোঁজের ঘটনা

স্থানীয় সময় ১৭ এপ্রিল বিকেল সাড়ে চারটার পর ইউএসএফের শিক্ষার্থী ওমর হোসাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ বিভাগে গিয়ে জানান, আগের দিন সকাল ১০টার পর থেকে তিনি বৃষ্টির কোনো দেখা পাননি। ওমর বৃষ্টিকে ফোন করার চেষ্টা করলেও তার ফোন বন্ধ ছিল। পরে তিনি লিমনকে ফোন করেন, কিন্তু তার ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। ওমর অ্যাভালন হাইটস স্টুডেন্ট হাউজিং কমপ্লেক্সে লিমনের ফ্ল্যাটে যান এবং সেখানে লিমনের স্কুটার দেখতে পান। লিমনের রুমমেট ঋষিত রাজ মাথুর তাকে জানান, তিনিও লিমনকে দেখেননি।

নিশাত তাসনিম নামের আরেক বন্ধু বলেন, ১৬ এপ্রিল বৃষ্টির সঙ্গে তার দুবার কথা হয়েছিল, কিন্তু বিকেল পাঁচটায় দেখা করার কথা থাকলেও বৃষ্টি আসেনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তদন্তের অগ্রগতি

পুলিশ ইউএসএফ ক্যাম্পাসের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ভবনে বৃষ্টির কার্যালয় থেকে তার আইপ্যাড ও টিফিন বক্স উদ্ধার করে। ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দুপুরের কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি ভবন থেকে বেরিয়ে উত্তর দিকে হেঁটে যাচ্ছেন।

লিমনকে খুঁজতে পুলিশ তার ফোনের সিগন্যাল ট্র্যাক করে। ১৬ এপ্রিল মধ্য বিকেলে ফোনটির অবস্থান ইউএসএফ ক্যাম্পাসে ছিল। পরে দিনের শেষে ফোনটি কোর্টনি ক্যাম্পবেল কজওয়ের কাছে পাওয়া যায়। আরও দুবার ট্র্যাক করে ফোনটি ক্লিয়ারওয়াটার বিচের উত্তরে স্যান্ড কি পার্ক এলাকায় শনাক্ত হয়।

সন্দেহভাজনের আচরণ

গোয়েন্দারা লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তার বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ ছিল এবং সেখানে কেটে যাওয়ার দাগ ছিল। আবুঘরবেহ দাবি করেন, পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে তার আঙুল কেটে গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, ১৬ এপ্রিল গভীর রাতে আবুঘরবেহর হুন্দাই জেনেসিস জি৮০ গাড়িটি কোর্টনি ক্যাম্পবেল কজওয়েতে লাইসেন্স প্লেট রিডারে ধরা পড়ে। ঠিক ওই সময়ে লিমনের ফোনটিও ওই ব্রিজে থাকার সংকেত দিয়েছিল। গাড়িটি ইউএসএফ এলাকা থেকে কজওয়ে, ক্লিয়ারওয়াটার এবং স্যান্ড কি এলাকা ঘুরে গভীর রাতে টাম্পায় ফিরে আসে।

জিজ্ঞাসাবাদে আবুঘরবেহ প্রথমে বলেন, নিখোঁজ শিক্ষার্থীরা তার গাড়িতে ছিলেন না। কিন্তু গোয়েন্দারা লিমনের ফোনের রেকর্ড দেখালে তিনি বয়ান পাল্টিয়ে বলেন, লিমন তাকে সেখানে নিয়ে যেতে বলেছিলেন এবং তিনি তাদের নামিয়ে দিয়ে চলে আসেন।

ফ্ল্যাটে রক্তের দাগ

গোয়েন্দারা আবুঘরবেহ ও লিমনের ফ্ল্যাটের ডাস্টবিন থেকে আবর্জনা সংগ্রহ করেন। সেখানে ট্র্যাশ ব্যাগ, লাইজল ওয়াইপস, ফিব্রিজ, ফানিয়ানস এবং আইরিশ স্প্রিং বডি ওয়াশ কেনার সিভিএস রসিদ পাওয়া যায়। রসিদে ১৬ এপ্রিল রাত ১০টা ৪৭ মিনিট লেখা ছিল। আবুঘরবেহ এসব জিনিস কেনার কথা অস্বীকার করলেও সিভিএসের ভিডিওতে একজন ডেলিভারি ড্রাইভারকে এসব কিনতে দেখা যায়। মাথুর জানান, আবুঘরবেহই এসব অর্ডার করেছিলেন।

আবর্জনার ভেতরে এক টুকরা রুপালি রঙের ডাক্ট টেপ পাওয়া যায়, যাতে লাল দাগ ছিল এবং পরীক্ষায় তা রক্ত বলে প্রমাণিত হয়। লিমনের শোবার ঘর থেকে বৃষ্টির কয়েন পার্স, ইউএসএফ পরিচয়পত্র, কেডস এবং একটি ছাতা উদ্ধার করা হয়। ক্যাম্পাসের সিসিটিভিতে শেষবার বৃষ্টিকে এই ছাতা হাতে দেখা গিয়েছিল।

মাথুর জানান, ফ্ল্যাট থেকে রান্নাঘরের ম্যাট, গ্যাটোরেড লোগোযুক্ত সাদা তোয়ালে এবং লিমনের হাঁড়ি-কড়াই গায়েব হয়ে গেছে। আবুঘরবেহ ফ্ল্যাট থেকে কার্ডবোর্ডের বাক্স ট্র্যাশ কম্প্যাক্টরে নেওয়ার জন্য মাথুরের ঠেলাগাড়ি ব্যবহার করেছিলেন।

ট্র্যাশ কম্প্যাক্টরের ভেতরে হাঁড়ি-পাতিল, লিমনের মানিব্যাগ ও চশমা এবং বৃষ্টির গোলাপি আইফোন কেস পাওয়া যায়। এছাড়া রান্নাঘরের ফ্লোর ম্যাট, এক জোড়া স্লাইড জুতা এবং কিছু কাপড় পাওয়া যায়। কাপড়ের মধ্যে ছিল ছিদ্রযুক্ত ধূসর শার্ট, ধূসর হাফপ্যান্ট ও তিন জোড়া মোজা, যাতে দাগ লেগে ছিল এবং পরীক্ষায় তা রক্ত বলে প্রমাণিত হয়।

ফ্ল্যাটে ফরেনসিক পরীক্ষায় রান্নাঘর থেকে আবুঘরবেহর শোবার ঘর পর্যন্ত ছোট ছোট রক্তের ফোঁটার দাগ পাওয়া যায়। রান্নাঘর, বসার ঘর ও বারান্দায় বড় পরিসরে রক্তের দাগ দেখা যায়। আবুঘরবেহর শোবার ঘরের মেঝেতে দুটি ‘মোটামুটি মানুষের আকারের’ ছাপ পাওয়া যায়। কার্পেটেও রক্তের উপস্থিতি ধরা পড়ে। বিছানার নিচে ট্র্যাশ ব্যাগ ও ডাক্ট টেপ লুকানো ছিল।

সন্দেহভাজনের চ্যাটজিপিটি প্রশ্ন

আবুঘরবেহর ফোনের রেকর্ডে দেখা যায়, ১৭ এপ্রিল মধ্যরাতের পর তিনি দ্বিতীয়বারের মতো টাম্পা বে গিয়েছিলেন। তার যাওয়ার পথ হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ পেরিয়ে উত্তর সেন্ট পিটার্সবার্গ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

বৃহস্পতিবার লিমন ও বৃষ্টির নিখোঁজ হওয়ার খবর গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘নিখোঁজ বিপন্ন প্রাপ্তবয়স্ক বলতে কী বোঝায়?’ তদন্ত কর্মকর্তারা আবুঘরবেহর ফোন ঘেঁটে আরও তথ্য পেয়েছেন যে, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে থেকেই তিনি চ্যাটজিপিটিকে একাধিক প্রশ্ন করেছিলেন। ১৩ এপ্রিল করা প্রথম প্রশ্নে তিনি ‘একজন মানুষকে’ ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া সম্পর্কে জানতে চান।