গত ২৬ জুন চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ ভবন সিআইটিআইসি টাওয়ারে একটি ছোট উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। এতে পাইলট নিহত এবং উড়োজাহাজের বাইরে ১৩ জন আহত হন। ঘটনার এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কর্তৃপক্ষ এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
ঘটনার বিবরণ ও তদন্তের অগ্রগতি
স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটে এক ইঞ্জিনের দুই আসনবিশিষ্ট স্পোর্টস উড়োজাহাজটি বেইজিংয়ের পূর্ব থার্ড রিং রোডের কাছে একটি সুউচ্চ ভবনে আঘাত হানে। কর্তৃপক্ষ ভবনের নাম উল্লেখ না করলেও রয়টার্সের বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ভবনটি সিআইটিআইসি টাওয়ার, যা চায়না জুন নামেও পরিচিত। ৫২৮ মিটার (১ হাজার ৭৩২ ফুট) উঁচু এই আকাশচুম্বী ভবনটি বেইজিংয়ের মূল বাণিজ্যিক কেন্দ্রে অবস্থিত।
দুর্ঘটনার পর তোলা ছবিতে ভবনের ওপরের দিকের কাচের দেয়ালে ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে, যেখানে দুটি বড় এক্সটেরিয়র প্যানেল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। উড়োজাহাজের সর্বশেষ রেকর্ডকৃত উচ্চতা ছিল প্রায় ২ হাজার ৮০০ ফুট, যা টাওয়ারের ছাদের চেয়ে প্রায় এক হাজার ফুট ওপরে।
উড়োজাহাজ ও পাইলটের পরিচয়
প্রাথমিকভাবে কর্তৃপক্ষ কেবল পাইলট নিহত হওয়ার তথ্য জানায়। এক সপ্তাহ পর চাওইয়াং এলাকার কর্তৃপক্ষ জানায়, পাইলট ৬৬ বছর বয়সী বেইজিংয়ের স্থানীয় বাসিন্দা, যার পারিবারিক নাম ‘লিউ’। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, লিউ দীর্ঘদিন ধরে অনিদ্রা ও হতাশায় ভুগছিলেন এবং তাঁর ডায়েরিতে বারবার আত্মহত্যার কথা উল্লেখ ছিল। তাঁর ব্যক্তিগত কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে বিবৃতিতে যোগ করা হয়।
উড়োজাহাজটি ছিল চীনে তৈরি দুই আসন ও এক ইঞ্জিনের স্পোর্টস উড়োজাহাজ ‘সানওয়ার্ড অরোরা এসএ৬০এল’, যার সর্বনিম্ন উড্ডয়ন গতি ঘণ্টায় ৭২ কিলোমিটার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে ‘বি-১২পিপি’ রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেখা গেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি বেইজিংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান দংশি শুয়াংইউয়ে জেনারেল এভিয়েশন পরিচালনা করত, তবে প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে নিশ্চিত নয়।
আকাশসীমায় প্রবেশের রহস্য
চীনের সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমায় কীভাবে উড়োজাহাজটি প্রবেশ করল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি বেইজিংয়ের শিফোসি বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে শহরের কেন্দ্রের দিকে পশ্চিম অভিমুখে উড়ছিল। চাওইয়াং এলাকায় এসে সেটির সিগন্যাল বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ অবস্থান ছিল সিআইটিআইসি টাওয়ার থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে। কর্তৃপক্ষের দেওয়া দুর্ঘটনার সময় এবং ফ্লাইটরাডার২৪-এর ট্র্যাকিংয়ের সময়ের মধ্যে অমিল থাকলেও হিসাব করে দেখা গেছে, সিগন্যাল হারানোর কয়েক মিনিটের মধ্যেই উড়োজাহাজটি টাওয়ারে পৌঁছাতে পারত।
নিরাপত্তা উদ্বেগ ও শিল্পের প্রতিক্রিয়া
এই দুর্ঘটনা চীনের দ্রুত সম্প্রসারণশীল স্বল্প উচ্চতার উড়োজাহাজ চলাচল (লো-অলটিটিউড এভিয়েশন) খাতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর কিছু পর্যটন ফ্লাইট অপারেটর এবং এভিয়েশন কোম্পানি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার অপেক্ষায় তাদের সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে। তদন্ত চলাকালে কর্তৃপক্ষ নতুন কোনো কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করবে কি না, তা নিয়ে শিল্পের ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ঘটনার আগের মুহূর্তে আরেকটি উড়োজাহাজ
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার ঠিক আগে হাইনান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৭১৪৬ বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের জন্য আসছিল। উড়োজাহাজ দুটি একে অপরকে অতিক্রম করার আগে তাদের উচ্চতার ব্যবধান ছিল মাত্র এক হাজার ফুটের কিছু বেশি। হাইনান এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজটি হঠাৎ করে নিজের উচ্চতা অনেক বাড়িয়ে নেয় এবং উড্ডয়নের পথ পরিবর্তন করে। এ বিষয়ে বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন্সের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।



