ইরানের ক্ষমতা কাঠামোয় ফাটল: যুদ্ধ সমাপ্তির আলোচনায় নতুন চ্যালেঞ্জ
ইরানের ক্ষমতা কাঠামোয় ফাটল, আলোচনায় চ্যালেঞ্জ

ইরানের ক্ষমতা কাঠামোয় ফাটল: যুদ্ধ সমাপ্তির আলোচনায় নতুন চ্যালেঞ্জ

মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক হামলার মুখেও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েনি, কিন্তু যুদ্ধের সমাপ্তি টানার চলমান আলোচনা এখন দেশটির সামনে এক নতুন এবং অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যেভাবে বিভিন্ন ক্ষমতাধর উপদলকে নিয়ন্ত্রণে রেখে এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ইরান পরিচালনা করেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কর্তৃত্ব কার হাতে আছে, তা স্পষ্ট নয় বলে মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে।

সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদে মতপার্থক্য

ইরানে এখন বেসামরিক ব্যক্তিত্ব এবং শক্তিশালী রেভল্যুশনারি গার্ডের জেনারেলদের সমন্বয়ে গঠিত একটি গোষ্ঠী দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন। তারা বর্তমানে কঠোর অবস্থান নিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় কতটুকু ছাড় দেওয়া হবে, তা নিয়ে গভীর মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। এই ফাটল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হতে যাওয়া নতুন দফার শান্তি আলোচনায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে।

ইসরায়েলি হামলায় প্রথম দিনেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে মোজতবার বর্তমান অবস্থা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে এক হামলায় তিনি আহত হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়েছিল। এরপর থেকে তিনি প্রকাশ্যে আসেননি। আড়ালে থেকে তিনি কীভাবে শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন, সেটি এখনও রহস্যের ঘেরাটোপে আবৃত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গালিবাফের মুখ্য ভূমিকা

বর্তমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। এই পরিষদে ইরানের শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা রয়েছেন। তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এখন এই পরিষদের মুখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছেন। খামেনির মৃত্যুর আগে এই পরিষদকে কিছুটা ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এখন এই কাউন্সিলই প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এই কাউন্সিলে রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যাপক বৈচিত্র্য এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। সেখানে যেমন সংস্কারপন্থি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন গালিবাফের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর বিরোধী সাঈদ জলিলির মতো প্রভাবশালী নেতা। রেভল্যুশনারি গার্ডের নতুন কমান্ডার আহমাদ ভাহিদি এবং কাউন্সিলের নতুন সচিব মোহাম্মাদ বাঘের জোলকাদরের মতো কট্টরপন্থিরাও এতে অন্তর্ভুক্ত।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিষয়ক পরিচালক আলী ওয়ায়েজ মনে করেন, ইসরায়েলের শীর্ষ নেতাদের হত্যার কৌশলটি ইরানের কার্যপ্রণালি বোঝার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। ইরানের নেতৃত্ব টিকে আছে কারণ সেখানে একাধিক ক্ষমতার কেন্দ্র রয়েছে যাদের কর্তৃত্ব একে অপরের সঙ্গে মিশে থাকে। তার মতে, উপদলীয় রাজনীতি এই ব্যবস্থার মজ্জায় মিশে আছে। তবে যুদ্ধের পর কাউন্সিলে রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রভাব বেড়ে যাওয়া এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে।

এখন এই কাউন্সিলকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কতটা ছাড় দিয়ে তারা চুক্তিতে পৌঁছাবে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। ইরান দীর্ঘকাল ধরে বলে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তাদের অধিকার।

টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে গালিবাফ বলেছেন, ইরান এমন একটি সমন্বিত চুক্তি চায় যা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনবে এবং যুক্তরাষ্ট্র আর কখনও ইরানকে আক্রমণ করবে না। তিনি এই বিপজ্জনক চক্র ভাঙার ওপর জোর দিয়েছেন।

অর্থনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা

যুদ্ধের সময় ইরান রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রভাব ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার কৌশল নিয়েছে। দেশটির নেতারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরান বেশি সময় ধরে এই চাপ সহ্য করতে পারবে। কিন্তু অর্থনীতির ধীরগতি এবং দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়ছে।

গত জানুয়ারিতে দেশটিতে সরকারের পতনের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনে ইরানের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের জনগণের চেয়ে পশ্চিমা শক্তির কাছে ছাড় দেওয়াটা সহজ মনে করতে পারে।

হরমুজ প্রণালি ঘটনা ও মতভেদের প্রকাশ

এই মতপার্থক্যের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা গিয়েছিল গত সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালির ঘটনাকে কেন্দ্র করে। শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে ঘোষণা করেছিলেন যে, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকবে। এর পরদিন ইরানের সামরিক বাহিনী জানায়, অবরোধের পাল্টা জবাব হিসেবে তারা পুনরায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিচ্ছে।

আরাঘচির ঘোষণার পর তাসনিম নিউজ এজেন্সি এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলে, এমন ঘোষণা খোদ নিরাপত্তা পরিষদের কাছ থেকে আসা উচিত ছিল। গালিবাফ সব পক্ষকে একীভূত করার চেষ্টা করলেও এই ধরনের বিভ্রান্তি প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে বড় ধরনের মতভেদ রয়েছে।

গালিবাফ: সম্ভাব্য সেতুবন্ধনকারী

এই প্রেক্ষাপটে মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে একটি সম্ভাব্য সেতু হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৬৪ বছর বয়সী গালিবাফ সাবেক জেনারেল এবং তেহরানের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি রেভল্যুশনারি গার্ড এবং রক্ষণশীলদের আস্থাভাজন হওয়ার পাশাপাশি সংস্কারপন্থিদেরও সমর্থন পাচ্ছেন। খামেনি পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকায় তাকে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গালিবাফ তার রাজনৈতিক দক্ষতা দিয়ে কট্টরপন্থিদের বাধা সামাল দিয়ে একটি চুক্তির দিকে দেশকে নিয়ে যেতে পারেন কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সব মিলিয়ে ইরান এক অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে চুক্তির প্রয়োজন এবং অভ্যন্তরীণ মতাদর্শের লড়াই সমানতালে চলছে।