ভারতের উত্তর প্রদেশে শক্তিশালী ধূলিঝড় ও বজ্রবৃষ্টির তাণ্ডবে অন্তত ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার রাজ্যের পাঁচটি জেলা ভাদোহি, ফতেপুর, বুদাউন, চন্দৌলি এবং সোনভদ্রের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই প্রলয়ংকরী ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে জনপদ। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ভাদোহি জেলায়। মাত্র কয়েক মিনিটের ঝড়ে উপড়ে গেছে শত শত গাছ, ধসে পড়েছে মাটির দেয়াল এবং বিকল হয়ে পড়েছে মোবাইল নেটওয়ার্ক। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ত্রাণকাজে যেকোনও ধরনের গাফিলতির বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
থান্ডারস্কুয়াল আসলে কী?
এটি কোনও সাধারণ বিকেলের বৃষ্টি নয়। থান্ডারস্কুয়াল হলো অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং শক্তিশালী এক বায়ুমণ্ডলীয় আলোড়ন। সহজভাবে বলতে গেলে, এটি আকাশের এক ‘বিশাল তাপীয় ইঞ্জিন’। মে মাসে উত্তর ভারতের সমতল ভূমিতে তাপমাত্রা যখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন ভূ-পৃষ্ঠের ওপরের বাতাস প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে দ্রুত ওপরের দিকে উঠতে থাকে, যাকে আবহাওয়াবিজ্ঞানীরা বলেন ‘কনভেকশন’। এই শূন্যস্থান পূরণ করতে অন্য দিক থেকে আর্দ্র ও শীতল বাতাস তীব্র বেগে ছুটে আসে। দুই বিপরীতমুখী বাতাসের সংঘর্ষে তৈরি হয় বিশাল আকৃতির ‘কিউমুলোনিম্বাস’ মেঘ। এই মেঘ থেকেই সৃষ্টি হয় বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি ও প্রবল ঝোড়ো হাওয়া। যখন এই মেঘগুলো ভেঙে পড়ে, তখন এর ভেতরকার শীতল বাতাস প্রচণ্ড বেগে মাটির দিকে আছড়ে পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে যায়। মাটির উপরিভাগের আলগা ধুলোবালি সঙ্গে নিয়ে এটি এক দানবীয় রূপ ধারণ করে, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘আঁধি’। এই আঁধির তীব্রতায় দৃষ্টিসীমা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
উৎপত্তি কোথায়?
১৩ মে ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, উত্তর পাকিস্তান ও জম্মু অঞ্চলের ওপর একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা অবস্থান করছে। এটি ভূমধ্যসাগর থেকে উৎপন্ন হওয়া একটি নিম্নচাপ। যা ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। গ্রীষ্মকালে এই পশ্চিমী ঝঞ্ঝা যখন সমতলের প্রচণ্ড তাপের সংস্পর্শে আসে, তখন এটি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। বুধবারের এই ঝড়ের আগে উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার।
মে মাস কেন উত্তর প্রদেশের জন্য বিপজ্জনক?
প্রাক-বর্ষা মৌসুমে উত্তর-পশ্চিম ভারতে মাটির তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকলেও বায়ুমণ্ডল স্থিতিশীল করার জন্য বর্ষার বৃষ্টি তখনও পৌঁছায় না। ফলে তাপমাত্রা ও চাপের এক বিশাল পার্থক্য তৈরি হয়। পুনের আইআইটিএম-এর গবেষক ও বিভিন্ন গবেষণাপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজস্থানের মরু অঞ্চল থেকে আসা শুষ্ক পশ্চিমী বাতাস এবং বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র পুবালি বাতাসের সংঘর্ষে এই তীব্র বজ্রঝড় ও ধূলিঝড়ের সৃষ্টি হয়। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় উত্তর প্রদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
জলবায়ু পরিবর্তন কি পরিস্থিতি আরও খারাপ করছে?
এই প্রশ্নে বিজ্ঞানীদের উত্তর হলো, হ্যাঁ। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে ‘পশ্চিমী ঝঞ্ঝা’ এখন আর কেবল নির্দিষ্ট ঋতুর অতিথি নয়, বরং সারা বছরের আপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা বেশি থাকা মানেই ঝড় তৈরির জন্য বাড়তি জ্বালানি মজুত থাকা। এর ফলে ঝড়গুলো আগের চেয়ে দ্রুত ঘনীভূত হচ্ছে এবং আরও বিধ্বংসী রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমতল ভূমিতে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ কাঁচা বাড়িতে বাস করেন, সেখানে এই ঝড় মৃত্যুর পরোয়ানা হয়ে আসে।
প্রাণহানী ঠেকানো যায় কীভাবে?
বজ্রপাত এই ঝড়ের কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, বরং একই প্রক্রিয়ার সরাসরি ফল। কিউমুলোনিম্বাস মেঘের ভেতরে বরফকণা ও জলবিন্দুর ঘর্ষণে বৈদ্যুতিক আধান তৈরি হয়, যা পরে বজ্রপাত হিসেবে মাটিতে নেমে আসে। ভাদোহি ও ফতেপুরে অধিকাংশ মৃত্যু হয়েছে গাছের নিচে বা মাটির নিচে আশ্রয় নেওয়ার কারণে। আবহাওয়াবিদদের পরামর্শ হলো, মে মাসের আকাশ যখন হলুদ হয়ে আসে আর দিগন্তে ধুলো উড়তে দেখা যায়, তখন দ্রুত কোনও পাকা দালানের ভেতর আশ্রয় নেওয়া উচিত। গাছ, কাঁচা দেয়াল বা খোলা মাঠ এই সময়ে সবচেয়ে অনিরাপদ স্থান। যথাযথ অবকাঠামো এবং জনসচেতনতা ছাড়া কেবল নিখুঁত পূর্বাভাস দিয়ে এই প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব নয়।



