ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী ‘তাপ বলয়’ সৃষ্টির শঙ্কা, স্পেন-ফ্রান্স-জার্মানিতে ১২৩ মৃত্যু
ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ, তাপ বলয় শঙ্কা, ১২৩ মৃত্যু

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত জনজীবন। স্পেনে মে মাসে তাপজনিত কারণে ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা ২০১৫ সালে পর্যবেক্ষণ শুরুর পর সর্বোচ্চ। ফ্রান্সে সাত ও যুক্তরাজ্যে কমপক্ষে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, ইউরোপের বিশাল অঞ্চলজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী হিট ডোম বা 'তাপ বলয়' সৃষ্টি হতে পারে।

তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছুঁইছুঁই, জারি সতর্কতা

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, এ সপ্তাহেও ইউরোপের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ফলে বিভিন্ন দেশে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গরমে পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

২১ জুন উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালীন আয়ন বা সবচেয়ে বেশি তাপের দিন। এদিন সূর্যালোকের সময় সবচেয়ে বেশি থাকে এবং সূর্য আকাশে সবচেয়ে উঁচু অবস্থানে থাকে। ফলে পৃথিবী ওই সময়ে সর্বাধিক সৌরশক্তি পায়, যা গরম বাড়ার ভিত্তি তৈরি করে। এতে ইউরোপসহ উত্তর গোলার্ধের অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। বিজ্ঞানীরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, এ বছর একই সময়ে সাহারা থেকে আসা উষ্ণ বায়ু একটি 'হিট ডোম' বা তাপ বলয় সৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হিট ডোম: কী এবং কেন?

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, তাপ বলয় পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের ওপর উষ্ণ বাতাস আটকে রাখছে এবং দিনের পর দিন তাপমাত্রা বাড়াতে সাহায্য করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পৃথিবী পর্যবেক্ষণ সংস্থা কপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্যমতে, পর্তুগাল, যুক্তরাজ্য এবং আয়ারল্যান্ড তাদের নিজস্ব আবহাওয়া কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে গত মে মাসে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করে। অন্যদিকে ফ্রান্সে জাতীয়ভাবে রেকর্ডকৃত উষ্ণতম মাস হিসেবে মে মাস চিহ্নিত হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কপার্নিকাস ক্লাইমেটের ডেটাসেট অনুসারে, পশ্চিম ইউরোপের বিশাল অংশে অনুভূত তাপমাত্রা এখন ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে, যা অত্যন্ত তীব্র তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি নির্দেশ করে।

দেশে দেশে সতর্কতা ও ক্ষয়ক্ষতি

রয়টার্স ও এপি জানায়, স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা এইএমইটি বেশ কয়েকটি অঞ্চলে লাল ও কমলা সতর্কতা জারি করেছে। কিছু অংশে ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার বিষয়ে সতর্ক করা হয়। ফ্রান্সের রেল নেটওয়ার্ক প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওভারহেড পাওয়ার লাইন এবং ট্রাক প্রসারিত হয়ে ঝুঁকি তৈরি করছে। নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণের জন্য ৩৫০০ কর্মীকে মোতায়েন করা হয়েছে এবং ৭১টি আন্তঃনগর ট্রেন বাতিল করা হয়। প্যারিসের লুভোর জাদুঘরও কনসার্ট বাতিল করেছে।

জার্মানির বার্লিন ওপেন টেনিস ফাইনাল স্থগিত করা হয়। বার্লিনসহ পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলগুলিতে তীব্র বজ্রঝড়ের সতর্কতা জারি হয়। বেলজিয়ামের নামুর শহরের কাছে পাখিসহ ১৫০টি প্রাণি তাপদাহে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ইতালির বোলোনিয়া, ফ্লোরেন্স, মিলান এবং তুরিনসহ আটটি শহরে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি জলবায়ুর একটি বৃহত্তর পরিবর্তনগত প্রবণতার প্রতিফলন।

তাপপ্রবাহ কি 'নতুন স্বাভাবিক'?

এপি লিখেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের মতে, বিশ্বব্যাপী ও ইউরোপে ২০২৫ সাল ছিল এযাবৎকালের তৃতীয় উষ্ণতম বছর। বিগত তিন বছর যথাক্রমে ২০২৪, ২০২৩ এবং ২০২৫—বিশ্বব্যাপী এযাবৎকালের উষ্ণতম বছর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

গত বছর কয়েক ডজন দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা দেশগুলোকে খরার দিকে ঠেলে দিয়েছে, দাবানলের সৃষ্টি করেছে এবং হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষকরা ৮৫৪টি ইউরোপীয় শহর পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, গত গ্রীষ্মে আনুমানিক ২৪ হাজার ৪০০ তাপজনিত মৃত্যুর ৬৮ শতাংশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী ছিল।

একক তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো হলো রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, গ্রিস এবং সাইপ্রাস। যেখানে গত বছর ২১ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত গড় তাপমাত্রার চেয়ে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা ছিল। ফলে আনুমানিক ৯৫০ জনের তাপজনিত মৃত্যু ঘটে, অর্থাৎ প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে দৈনিক প্রায় ১১ জনের মৃত্যু।

ডব্লিউএফওয়াই২৪ এর আবহাওয়াবিদ ইওয়ানা ভার্জিনি ইউরোনিউজ আর্থকে বলেছেন, 'ইউরোপীয় গ্রীষ্মকাল শুধু উষ্ণতরই হচ্ছে না – এটি দুই প্রান্তেই দীর্ঘতর হচ্ছে।'