চট্টগ্রাম নগরের চশমা হিলের মেয়র গলি এলাকায় পাহাড়ধসে ১৩ বছর বয়সী সামিয়া ইসলাম নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আজ বুধবার বেলা ১১টার দিকে মুক্তিযোদ্ধা পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে তাদের টিনের ঘরের ওপর। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা যায় সে।
ঘটনার বিবরণ
সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড়ের পাদদেশে সারি করে থাকা টিনের ঘরগুলোর একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদামাটি ঘরের এক পাশ পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছে। ঘরের পেছনটা ডুবে আছে হাঁটুসমান কাদায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকাল থেকে একটানা বৃষ্টি হচ্ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যায়। তখন ঘরে একাই ছিল সামিয়া। হঠাৎ পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে টিনের ঘরের ওপর। মুহূর্তেই মাটি, গাছপালা আর ভাঙা দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে যায় সে।
উদ্ধার প্রচেষ্টা ও শোক
প্রতিবেশীর চিৎকার শুনে আশপাশের মানুষ ছুটে আসেন। কেউ খালি হাতে কাদা সরিয়েছেন, কেউ ভাঙা দেয়ালের ইট সরানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনোভাবেই সামিয়ার কাছে পৌঁছানো যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তাকে বের করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে তার মৃত্যু হয়েছে।
সামিয়ার বড় বোন রিয়া আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমার বোনটারে এনে দেন। আমার ছোট বোনটা সকালেই আমার সঙ্গে বসে ভাত খাইল। আমার বোনটারে আমার বুকে ফিরায় দেন।’ সামিয়ার খালা শ্যামলী বেগম বলেন, ‘মেয়েটা সবার আদরের ছিল। স্কুলে পড়ত। ওকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল! একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম, বড় হলে কাজে লাগবে। কিন্তু তার আগেই সব শেষ হয়ে গেল।’
পরিবারের অবস্থা ও প্রতিবেশীদের বক্তব্য
সামিয়া তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট। তার মা শিরিন বেগম গৃহকর্মী এবং বাবা মোহাম্মদ ফারুক মাছ বিক্রেতা। দুর্ঘটনার সময় বাসায় কেউ ছিলেন না। খবর পেয়ে ছুটে এসে তারা মেয়েকে উদ্ধারের চেষ্টা দেখেন, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। প্রতিবেশী মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ‘বৃষ্টি এত বেশি ছিল যে দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। তারপরও আমরা কয়েকজন মিলে মাটি সরানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু দেয়াল আর কাদার নিচ থেকে ওকে বের করতে পারিনি।’
বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি
চট্টগ্রামে কয়েক দিন ধরে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে আজ বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর আজ বেলা ৩টা পর্যন্ত রেকর্ড হয়েছে ১০৬ মিলিমিটার বৃষ্টি। এটি অতি ভারী বর্ষণের মধ্যে পড়ে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। আগামী অন্তত দুই দিন একই ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে।’
টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। নগরের পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোতে বসবাসকারীদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন পাহাড়ে মাইকিং করছে এবং পাহাড়ের বসতিদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে, তবে কাজের কাজ হচ্ছে না। এখনো পাহাড়গুলোতে রয়ে গেছে অবৈধ বসতি।
আগের ঘটনা
এর আগে গতকালও টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরে আরেকটি প্রাণ ঝরে যায়। পাঁচলাইশ থানার রহমাননগর এলাকায় পাহাড়ের ওপর দেয়ালচাপায় মারা যান ৩২ বছর বয়সী সফিকুল ইসলাম। ওই ঘটনায় তার দেড় বছর বয়সী মেয়ে সাইফা ও শাশুড়ি মর্জিনা বেগম আহত হন।



