ফেনীতে আবারও বন্যার আশঙ্কা, নদীর পানি বাড়ছে, আতঙ্কে লাখো মানুষ
ফেনীতে আবারও বন্যার আশঙ্কা, নদীর পানি বাড়ছে

২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি ফেনীর মানুষজন। এরই মধ্যে টানা বর্ষণ এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে সম্ভাব্য ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে আবারও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলার মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বাড়তে শুরু করায় নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া ও সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী লাখো মানুষের মধ্যে গত বন্যার স্মৃতি আবারও আতঙ্ক তৈরি করছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কতা

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ৫ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর প্রভাবে ফেনীসহ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কয়েকটি স্থানে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। একইসঙ্গে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চলেও স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উজানে অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢল একসঙ্গে নেমে এলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি যেতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত বছরের বন্যার স্মৃতি

২০২৪ সালের আগস্টে ফেনীর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বন্যায় জেলার ছয়টি উপজেলার প্রায় ১৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। সেই দুর্যোগে অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছিল। এখনও সেই স্মৃতি ভুলতে পারেননি বাসিন্দারা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরশুরাম উপজেলার সাতকুচিয়া এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, ‘গত বছরের বন্যায় আমাদের ঘরবাড়ি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অনেক কষ্ট করে আবার ঘর মেরামত করেছি। এখন আবার বৃষ্টি শুরু হওয়ায় পরিবার নিয়ে আতঙ্কে আছি।’

ফুলগাজী উপজেলার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গত বছরের বন্যায় মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর যেসব বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলোর অনেক অংশ এখনো স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হয়নি। ফলে পাহাড়ি ঢলের চাপ বাড়লে বাঁধ টিকবে কিনা, তা নিয়ে তারা শঙ্কিত।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি

স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর উজানের পানির কারণে ফেনীতে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সীমান্তবর্তী নদীগুলোর খনন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং নদী ব্যবস্থাপনার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

প্রশাসনের প্রস্তুতি

সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু করেছে। উপজেলা প্রশাসনগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েকদিন বৃষ্টিপাত আরও বাড়তে পারে। অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢল একসঙ্গে এলে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা আছে।’

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ফেনীসহ পাঁচ জেলার জন্য বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কতা জারি রয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক নদ-নদীর পানি পর্যবেক্ষণ করছি। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’

জনগণের প্রস্তুতি ও সতর্কতা

এদিকে সম্ভাব্য বন্যার খবর ছড়িয়ে পড়ায় নদীতীরবর্তী অনেক পরিবার ইতোমধ্যে শুকনা খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি এবং গবাদিপশুর নিরাপদ আশ্রয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। প্রশাসনও জনগণকে গুজবে কান না দিয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ এবং নদীর পানি পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্যের প্রতি নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছে।