মঙ্গলবার রাত আটটায় চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস। সকালে যখন ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে উঠেছিলেন, তখন শিশুদের চোখেমুখে ছিল সমুদ্র দেখার আনন্দ। কেউ জানালার পাশে বসে বাইরের দৃশ্য দেখছিল, কেউ আবার কক্সবাজারে গিয়ে কী করবে, সেই পরিকল্পনা করছিল; কিন্তু দিন শেষে সেই আনন্দের জায়গা দখল করেছে ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা আর বিরক্তি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই ট্রেনে বসে থাকতে থাকতে শিশুদের কেউ কাঁদছে, কেউ ঘুমিয়ে পড়ছে সিটেই, কেউ আবার বারবার একটা প্রশ্নই করছে, ‘আর কতক্ষণ?’
১৪ ঘণ্টা ধরে আটকা ট্রেনে
তানজিনা রহমান পাঁচটি শিশু ও তিনজন নারীসহ মোট নয়জনের দল নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন। সকাল ছয়টায় কমলাপুর থেকে ট্রেনে উঠেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল বিকেলের মধ্যে সমুদ্রসৈকতে পৌঁছে যাবেন; কিন্তু রাত গড়িয়ে গেলেও তাঁরা চট্টগ্রামেই আটকে আছেন।
ট্রেনের ভেতর থেকেই প্রথম আলোকে তানজিনা রহমান বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়িনি। ট্রেনে বসে থাকতে থাকতে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। বাচ্চারা বিরক্ত হয়ে গেছে। ঘুম, খাওয়াদাওয়া— সব এলোমেলো হয়ে গেছে। এক দিন পুরোটা কেটে গেল ট্রেনে। এই এক দিন দীর্ঘ লাগছে।’
পাশেই বসেছিলেন তানজিনা রহমানের স্বজন আমেনা আক্তার। বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। বিরক্তি আর অনিশ্চয়তা মিলেমিশে কণ্ঠ ভারী হয়ে এসেছে তাঁর। তিনি বলেন, ‘দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে শুনছি, আরেকটু পর ট্রেন ছাড়বে। এক ঘণ্টা পর, আধা ঘণ্টা পর; এভাবেই বলা হচ্ছে। কিন্তু কেউ পরিষ্কার করে কিছু বলছে না। এখন জানি না, কখন কক্সবাজার পৌঁছাব, আদৌ পৌঁছাতে পারব কি না।’
ট্রেনের বগিতে যাত্রীদের অপেক্ষা
শুধু তানজিনারা নন, পর্যটক এক্সপ্রেসের প্রায় এক হাজার যাত্রীর দিন কেটেছে একইভাবে। অধিকাংশ যাত্রীই ঢাকা থেকে ট্রেনে উঠেছিলেন। ঢাকার কমলাপুর থেকে সকাল সোয়া ছয়টায় যাত্রা শুরু করা ট্রেনটি দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে চট্টগ্রামের ষোলশহর স্টেশন অতিক্রম করে। এরপর সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকায় গিয়ে থেমে যায়। সামনে রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ট্রেনটি আবার ষোলশহর স্টেশনে ফিরিয়ে আনা হয়। অথচ ট্রেনটির কক্সবাজারে পৌঁছানোর নির্ধারিত সময় ছিল বেলা ২টা ৪০ মিনিটে।
বিকেল গড়িয়ে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোগান্তি বাড়ে
রাহাতুন জাহান ১৬ সদস্যের পরিবার নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন। তাঁদের দলে শিশু, নারী ও প্রবীণ—সবাই আছেন। ভেবেছিলেন, বিকেলে পৌঁছে হোটেল খুঁজবেন। আগে থেকে কোনো কক্ষ বুকিংও দেননি; কিন্তু বাস্তবতা বদলে দেয় সব পরিকল্পনা। রাহাতুন বলেন, ‘এত বড় ভোগান্তি আগে কখনো হয়নি। বাচ্চারা বিশ্রাম চাচ্ছে। ওদের সামলানোই কঠিন হয়ে গেছে। সবাই ক্লান্ত।’
ভুল তথ্যের কারণে আরও বিপদ
একই ট্রেনে ছিলেন আইনজীবী রুহুল আমিন। দীর্ঘ অপেক্ষায় বিরক্ত হয়ে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পরিবার নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে বিকল্প যানবাহনের ব্যবস্থা করেছিলেন। দুই হাজার টাকা দিয়ে একটি গাড়িও ভাড়া করেন; কিন্তু রেলওয়ের কর্মীরা তাঁকে আবার ট্রেনে উঠতে বলেন।
রুহুল আমিন বলেন, ‘কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেন ছেড়ে দেওয়া হবে—এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তাই গাড়ি ছেড়ে দিয়ে আবার ট্রেনে উঠি; কিন্তু কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলেও ট্রেন ছাড়েনি। ভুল তথ্যের কারণে আমরা আরও বিপদে পড়েছি।’
ভারী বৃষ্টির কারণে রেললাইন তলিয়ে
যাত্রীদের এই দুর্ভোগের পেছনে ছিল টানা অতি ভারী বৃষ্টি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বেলা ৩টা থেকে মঙ্গলবার বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ১৯৮৩ সালের পর এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড।
এই বৃষ্টিতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তলিয়ে যায় সড়কের পাশাপাশি কয়েকটি রেললাইনও। নিরাপত্তার স্বার্থে কক্সবাজারমুখী ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। আর সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব গিয়ে পড়ে সমুদ্র দেখতে বের হওয়া শত শত পরিবারের ওপর। দিনের শুরুতে যাঁদের চোখে ছিল ভ্রমণের উচ্ছ্বাস, রাত নামার পর তাঁদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হয়ে দাঁড়ায়—কবে ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করবে।
পানি ও জ্বালানি সংগ্রহের পর ছাড়ার সময় ঠিক হবে
রাত সাড়ে ৯টার দিকে জানা যায়, ট্রেনটি চট্টগ্রামের ষোলশহর স্টেশন থেকে নেওয়া হয়েছে চট্টগ্রামের মূল স্টেশনে। সেখান থেকে পানি ও জ্বালানি সংগ্রহ করা হবে। এরপর ছাড়ার সময় ঠিক হবে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সফিকুর রহমান রাতে প্রথম আলোকে বলেন, রেললাইনে পানি থাকার কারণে ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। লাইন থেকে পানি নামার অপেক্ষায় আছেন তাঁরা। পানি নামলে ট্রেন চালানো হবে।



