মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চলমান চীন সফরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন একঝাঁক মার্কিন করপোরেট জায়ান্ট ও তাদের শীর্ষ নির্বাহী বা সিইওরা। মূলত নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে একটি বড় রাজনৈতিক বিজয় সুনিশ্চিত করা এবং চীনের বিশাল বাজারে নিজেদের ব্যবসার প্রসার ঘটানোই এই সফরের মূল লক্ষ্য। গত বছর ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের জবাবে চীনের পাল্টা শুল্ক আরোপের ফলে তৈরি হওয়া দীর্ঘস্থায়ী ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ নিরসনে এই সিইওরা এখন ট্রাম্পের তুরুপের তাস।
সিইওদের তালিকা ও তাদের উদ্দেশ্য
বুধবার (১৩ মে) বেইজিংয়ে পৌঁছানোর পর ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, তারা মার্কিন ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ‘বিশিষ্ট প্রতিনিধি’, যারা চীনকে অত্যন্ত সম্মান করেন এবং গুরুত্ব দেন। জিনপিংও তাদের স্বাগত জানিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যবসার পরিধি আরও বৃদ্ধির আশ্বাস দিয়েছেন। এই প্রতিনিধি দলে রয়েছেন টেসলা ও স্পেসএক্স-এর ইলন মাস্ক, অ্যাপল-এর টিম কুক, এনভিডিয়া-র জেনসেন হুয়াং এবং গোল্ডম্যান স্যাকস-এর ডেভিড সলোমন। এছাড়াও ব্ল্যাকরক, সিটি গ্রুপ, ব্ল্যাকস্টোন এবং বোয়িংয়ের মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা এই সফরে ট্রাম্পের সঙ্গী হয়েছেন।
অর্থনৈতিক স্বার্থ ও নির্ভরশীলতা
ব্যবসায়ী নেতাদের এই সফরের নেপথ্যে রয়েছে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক স্বার্থ। প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলো বিশেষ করে ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল মৃত্তিকা ধাতুর জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল, যা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ইলন মাস্ক চীনে টেসলার ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ সিস্টেমের অনুমোদন এবং সোলার প্যানেল তৈরির জন্য প্রায় ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের সরঞ্জাম কেনার লক্ষ্য নিয়ে এসেছেন। অন্যদিকে, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং চাইছেন চীনের ৫০ বিলিয়ন ডলারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বাজারে তাদের উন্নত 'H200' চিপ বিক্রির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে। একইভাবে অ্যাপল ও বোয়িং তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বিশাল বিক্রয়াদেশ নিশ্চিত করতে বেইজিংয়ের সাথে নতুন চুক্তির অপেক্ষায় আছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিকভাবে এই সফর ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে চাপে থাকা ট্রাম্প সিলিকন ভ্যালির সমর্থন ও মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজের জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার করতে চান। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প এই সিইওদের মাধ্যমে মার্কিন ভোটারদের দেখাতে চান যে তিনি চীনের বাজার উন্মুক্ত করছেন। তবে এর বিনিময়ে চীনও হয়তো মার্কিন শুল্ক প্রত্যাহার এবং উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের মতো কঠিন দাবিগুলো টেবিলে রাখবে। শেষ পর্যন্ত এই ‘ব্যবসায়িক কূটনীতি’ বিশ্ব অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



