বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে নিজের কষ্টার্জিত সঞ্চয় নিরাপদ রাখার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একটি মূল্যবান ধাতু—স্বর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই এটি নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পদের মূল্য সংরক্ষণ, ঝুঁকি কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রিটার্ন পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বর্ণ এখনো অন্যতম কার্যকর বিনিয়োগমাধ্যম।
মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা
সময়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির কারণে কাগজের মুদ্রার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমেই কমে যায়। অর্থাৎ, আজ যে পরিমাণ অর্থ দিয়ে একটি পণ্য কেনা সম্ভব, কয়েক বছর পর একই অর্থে তা আর কেনা যায় না। কিন্তু স্বর্ণ দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের প্রকৃত মূল্য ধরে রাখতে সহায়তা করে। এ কারণেই মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে এটি একটি কার্যকর সুরক্ষা বা ‘হেজ’ হিসেবে পরিচিত।
পরিসংখ্যানও সেই বাস্তবতাই তুলে ধরে। তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ বছরে যুক্তরাজ্যে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। একই সময়ে স্বর্ণের দাম বছরে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাদ দিলেও স্বর্ণের প্রকৃত মূল্য গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।
অর্থনৈতিক সংকটে নিরাপদ আশ্রয়
কোনো দেশের মুদ্রার মূল্য সাধারণত সেই দেশের সুদের হার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি এবং অর্থ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বিপরীতে, স্বর্ণের দাম নির্ধারিত হয় আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে। এ কারণেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, আর্থিক সংকট কিংবা যুদ্ধসহ বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে স্বর্ণ একটি নিরাপদ সম্পদ (Safe Haven Asset) হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
বিনিয়োগে ভারসাম্য আনে স্বর্ণ
সুষম বিনিয়োগ পরিকল্পনায় শুধু নগদ অর্থ, শেয়ার, বন্ড বা স্থাবর সম্পদের ওপর নির্ভর না করে স্বর্ণকেও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণ প্রায়ই ভালো পারফরম্যান্স দেখায়। ফলে অন্যান্য খাতে সম্ভাব্য লোকসানের প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনতে এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ফিডেলিটি ইন্টারন্যাশনালের পার্সোনাল ইনভেস্টিং বিভাগের পরিচালক টম স্টিভেনসন মনে করেন, একটি সুষম ও শক্তিশালী বিনিয়োগ পোর্টফোলিও গঠনে স্বর্ণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তার ভাষায়, "স্বর্ণ শেয়ার বা বন্ডের মতো আচরণ করে না; বরং ভিন্ন ধরনের সম্পদ হিসেবে এটি বিনিয়োগে বৈচিত্র্য এনে ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।" তিনি আরও বলেন, "প্রাচীনকাল থেকেই স্বর্ণ সম্পদ সংরক্ষণের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। স্বল্পমেয়াদে এর দামে ওঠানামা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সাধারণত নিজের অন্তর্নিহিত মূল্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়।"
উপসংহার
সব মিলিয়ে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক সংকটের সময়ে স্বর্ণ শুধু একটি মূল্যবান ধাতুই নয়; বরং সম্পদ সুরক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনার অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়। সূত্র: ফোর্বস।



