গ্রীষ্মকালে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। উচ্চ তাপমাত্রা খাবার ও পানিতে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের দ্রুত বিস্তারে সহায়তা করে, ফলে পেটের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডায়রিয়া কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়, তবে নবজাতক ও অল্প বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। তাই ডায়রিয়া হলে ঘরে কী করণীয় এবং কোন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
কেন বাড়ে ডায়রিয়ার ঝুঁকি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, গরমের সময়ে দূষিত খাবার বা পানি গ্রহণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা, বাইরে খাওয়া, অপরিষ্কার পানিতে গোসল করা কিংবা হাত পরিষ্কার না রাখার কারণে পরিপাকতন্ত্রে সংক্রমণ হতে পারে। রোটাভাইরাস, নোরোভাইরাস, ই-কোলাই এবং সালমোনেলার মতো জীবাণু ডায়রিয়ার সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ঘরে বসে যা করবেন
১. পর্যাপ্ত তরল দিন
ডায়রিয়ার সময় শরীর থেকে প্রচুর পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট বের হয়ে যায়। তাই এগুলোর ঘাটতি পূরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
- শিশুর বয়স অনুযায়ী ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওরস্যালাইন) পান করান।
- বমি হলে একসঙ্গে বেশি না দিয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ান।
- বুকের দুধ বা ফর্মুলা দুধ খাওয়ানো বন্ধ করবেন না।
- বড় শিশুদের পানি, ডাবের পানি কিংবা হালকা স্যুপ দেওয়া যেতে পারে।
- কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত ফলের রস ও এনার্জি ড্রিংকস এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো ডায়রিয়া বাড়াতে পারে।
২. খাবার বন্ধ নয়
অনেকেই ডায়রিয়া হলে শিশুকে না খাইয়ে রাখেন, যা ভুল ধারণা। এ সময় সহজপাচ্য খাবার যেমন ভাত, খিচুড়ি, কলা ও দই (সহ্য করতে পারলে) খেতে দেওয়া উচিত। এসব খাবার শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি ও পুষ্টি জোগায় এবং সুস্থ হতে সাহায্য করে।
৩. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করুন
ডায়রিয়ার কারণে শিশুরা দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে এবং দ্রুত সুস্থ হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। তাই এ সময় শিশুকে অতিরিক্ত দৌড়ঝাঁপ থেকে বিরত রাখুন।
৪. পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
ডায়াপার পরিবর্তনের পর এবং খাবার তৈরি বা পরিবেশনের আগে অবশ্যই সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। এতে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে। পাশাপাশি শিশুর ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর দিতে হবে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন—
- মুখ শুকিয়ে যাওয়া, কান্নার সময় চোখে পানি না আসা, চোখ কোটরে ঢুকে যাওয়া বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে।
- বারবার বমি হলে।
- মলের সঙ্গে রক্ত বা শ্লেষ্মা বের হলে।
- উচ্চমাত্রার জ্বর থাকলে।
- তীব্র পেটব্যথা হলে।
- ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার বেশি সময় ডায়রিয়া স্থায়ী হলে।
- অতিরিক্ত ক্লান্তি, খিটখিটে মেজাজ বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব দেখা দিলে।
বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি, কারণ তাদের শরীরে অল্প সময়েই পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে।
প্রতিরোধে করণীয়
- শিশুদের নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- টাটকা ও ঘরে তৈরি খাবার খেতে উৎসাহিত করুন।
- খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করুন।
- নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারে গুরুত্ব দিন।
- ফল ও শাকসবজি খাওয়ার আগে ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
সামান্য সতর্কতা ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে গরমকালে শিশুদের ডায়রিয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে জটিলতার কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।



