বাংলাদেশে বাড়ছে ৫ ক্যানসার: খাদ্যনালি, মুখ, ফুসফুস, স্তন, জরায়ু
বাংলাদেশে বাড়ছে ৫ ক্যানসার: খাদ্যনালি, মুখ, ফুসফুস, স্তন, জরায়ু

বাংলাদেশে প্রতিবছরই ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন এক লাখ ১৬ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন এক লাখ ৬৭ হাজারের বেশি ব্যক্তি। তবে চিকিৎসকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

খাদ্যনালির ক্যানসার

বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে খাদ্যনালির ক্যানসারে। ডব্লিউএইচওর ২০২২ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এ ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪২ হাজারের বেশি। প্রতিবছর আরও ২৫ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ১৫.১ শতাংশ। পুরুষদের মধ্যে এই ক্যানসারের হার বেশি। মৃত্যুর দিক থেকেও এটি শীর্ষে; প্রতিবছর ২৪ হাজারের বেশি মানুষ এ রোগে মারা যান, যা মোট ক্যানসার মৃত্যুর ২০.৯ শতাংশ।

মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসার

আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসার। বর্তমানে দেশে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০ হাজারের কিছু বেশি। প্রতি বছর নতুন করে আক্রান্ত হন ১৬ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে পুরুষ প্রায় ১১ হাজার এবং নারী প্রায় পাঁচ হাজার। এ রোগে প্রতিবছর মারা যান প্রায় সাড়ে ৯ হাজার মানুষ, যা মোট ক্যানসার মৃত্যুর ৮.১ শতাংশ। ২০২৬ সালে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ৮.৭১ শতাংশই মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফুসফুসের ক্যানসার

মৃত্যুহারের দিক থেকে খাদ্যনালির ক্যানসারের পরেই ফুসফুসের ক্যানসারের অবস্থান। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর এ রোগে ১২ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। বর্তমানে বাংলাদেশে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হন প্রায় ১৩ হাজার মানুষ, যাদের মধ্যে ১০ হাজারই পুরুষ। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ১৮ শতাংশই ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন, যা সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি।

স্তনের ক্যানসার

বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় স্তনের ক্যানসার। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যানসার আক্রান্ত নারীদের ৩৬.৪ শতাংশই স্তনের ক্যানসারে ভুগছেন। ডব্লিউএইচওর ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৩৫ হাজারের বেশি নারী এ রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হন প্রায় ১৩ হাজার নারী এবং মারা যান ৬ হাজারের বেশি।

জরায়ুমুখের ক্যানসার

স্তনের ক্যানসারের পর নারীদের মধ্যে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি জরায়ুমুখের ক্যানসারে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, নারী ক্যানসার রোগীদের ১৯ শতাংশ প্রজননতন্ত্রের ক্যানসারে ভুগছেন, যার মধ্যে ১১ শতাংশ জরায়ুমুখের, ৫ শতাংশ ডিম্বাশয়ের এবং ৩ শতাংশ জরায়ুর ক্যানসারে আক্রান্ত। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সাড়ে ২৬ হাজারের বেশি নারী জরায়ুমুখের ক্যানসারে ভুগছেন। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হন প্রায় সাড়ে ৯ হাজার নারী এবং মারা যান ৫ হাজার ৮০০ জনের বেশি।

কেন বাড়ছে ক্যানসার?

বাংলাদেশে ক্যানসারের বিষয়ে এখনো জাতীয় কোনো তথ্যভাণ্ডার তৈরি হয়নি। চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্তদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হাসপাতালে যান না, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বলেন, পরিবেশ দূষণ ক্যানসার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বায়ু দূষণের সঙ্গে ফুসফুসের ক্যানসারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার কারণেও ক্যানসার বাড়ছে। বিশেষ করে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, ধূমপান ও তামাকপাতা সেবন ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের নারীরা কম বয়সে স্তন ও জরায়ুর ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। ডা. সুমন বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে বয়স্ক নারীদের মধ্যে ব্রেস্ট ক্যানসার দেখা গেলেও আমাদের দেশে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সি নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে এই ক্যানসারগুলি প্রতিরোধ সম্ভব। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলেও কাভারেজ এখনো কম। টিকা কাভারেজ বাড়ানো ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নারীদের মধ্যে ক্যানসার আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব।