দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশে অবৈধভাবে পুশইনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড (বিজিবি) সেই প্রচেষ্টা প্রতিহত করছে। পুশইন ইস্যুতে ভারত স্পষ্ট অবস্থান না নিলেও ঢাকা স্পষ্ট জানিয়েছে, এই পুশইন গ্রহণ করা হবে না। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ঢাকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।
পুশইন ইস্যুতে ভারতের অস্পষ্টতা
ভারত পুশইন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনও স্পষ্ট বার্তা দেয়নি, বরং তারা বলছে যে অবৈধ নাগরিকদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। বাংলাদেশের দেওয়া একাধিক চিঠি নিয়েও দিল্লি কোনও পদক্ষেপের কথা জানায়নি। বেশ কয়েকটি সীমান্ত দিয়ে গত মে মাস থেকে নারী-পুরুষ ও শিশুদের বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করছে বিএসএফ। তবে বিজিবির বাধার মুখে তারা প্রবেশ করতে পারেননি। কয়েকটি সীমান্তে অনেকে এখনও শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।
সীমান্ত সম্মেলনে আলোচনা
ভারতের নয়াদিল্লিতে তিন দিনব্যাপী বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন শুরু হয়েছে। সেখানে পুশইন নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। সীমান্তে পুশইনের ঘটনায় এক ধরনের মানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো, সীমান্তে আটকে পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষও রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা দিনের পর দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে শূন্যরেখায় অবস্থান করতে বাধ্য হন, যা একটি গুরুতর মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক প্রভাব
পরিচয় যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দিলে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। বিজিবি ও সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, বিএসএফের পুশইন প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা বেড়েছে।
বিজিবির দৃঢ় অবস্থান
মে ও জুন মাসজুড়ে কতজনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তার কোনও সমন্বিত সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করছে বিজিবি। গত ৪ জুন মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ১০টি পুশইন ঠেকানোর কথা জানিয়েছে বিজিবি। পুশইন ঠেকাতে কোনও কোনও এলাকায় বিজিবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় গ্রামবাসী।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, “ইতোমধ্যে আমরা ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দিয়েছি দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। বিজিবি সজাগ আছে এবং কোনোভাবেই এটা আমরা গ্রহণ করছি না। সম্প্রতি আমরা চেন্নাই থেকে ৩৪ জনকে ফেরত এনেছি। অবৈধ নাগরিকদের আদান-প্রদানে দুই দেশেরই একটি মেকানিজম বিদ্যমান আছে। সেই বিদ্যমান মেকানিজমটা, ডিপ্লোমেসিটা অবলম্বন করেই ভারতকে আমাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। কথা বলতে হবে। আমরা যত রকম ডিপ্লোমেটিক ওয়ে আছে সেটি ফলো করছি। যখনই পুশইনের ঘটনা আমাদের কানে আসছে বা আমরা দেখছি রিপোর্টিং হচ্ছে, আমরা কিন্তু তাদের চিঠি দিচ্ছি। আমরা আশা করবো ভারত সরকার এটা সিরিয়াসলি নেবে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের কাজটি তারা সমাধান করবে। কোনোভাবে পুশইনের মাধ্যমে যদি তারা করে তাহলে অবশ্যই সেটি আমাদের জন্য ভালো হবে না।”
তিনি বলেন, “এভরি কেস, এভরি ইভেন্ট ডিফারেন্ট। একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত না। ভারতের সরকার যদি এটা সিরিয়াসলি নেয়, তাহলে আমাদের জন্য সম্পর্কটা এগিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হবে।”
ভারতের অবস্থান
অপরদিকে গত চার দিন আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দাবি করেছেন, তারা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং আইন মেনে অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছেন। এছাড়া বাংলাদেশের কাছে অবৈধ বাংলাদেশিদের তালিকা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন জয়সওয়াল। আর তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের বিষয়টি ত্বরান্বিত করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতামত
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুশইন ইস্যুকে কূটনৈতিকভাবে সমাধান করা উচিত। অবৈধ নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক যে কাঠামো আছে তার মধ্যে দিয়েই যাওয়া উচিত। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, “পুশইনকে শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।”
তার মতে, “বৈধ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক রীতি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য নেতিবাচক। বাংলাদেশের উচিত সীমান্তে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করা।”
সাবেক একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, “ভারত যদি কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বন না করতে থাকে তাহলে বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক কাঠামোর আশ্রয় নেওয়া। এই ইস্যুতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার শরণাপন্ন হতে পারে বাংলাদেশ। তবে সমাধান কূটনৈতিকভাবেই হওয়া উচিত।”
সাম্প্রতিক পুশইন ঘটনা
বিজিবি সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত মাত্র চার দিনে ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর (বঙ্গাবাড়ী), নওগাঁর সাপাহার (হাপানিয়া), লালমনিরহাটের বারখাতা ও পাটগ্রাম এবং পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়ে সরাসরি বিএসএফের সহায়তায় অন্তত ২৩টি পুশইনের ঘটনা ঘটেছে। এর মাধ্যমে দুই শতাধিক মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে বিজিবির দৃঢ় তৎপরতায় তা ব্যর্থ হয়। এই ঘটনার পর থেকে দেশের সীমান্তজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং বিজিবি সদস্যদের সশস্ত্র অবস্থায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।



