দেশে শিশু নিখোঁজ বা অপহরণের পর দ্রুত উদ্ধারের লক্ষ্যে ‘মুন অ্যালার্ট’ নামে একটি বিশেষ জরুরি সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পাশাপাশি নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে তথ্য দিতে বা সহায়তা পেতে ১৩২১৯ নম্বরের একটি টোল-ফ্রি হেল্পলাইনও উদ্বোধন করা হয়েছে। গত ২৭ মে রাজধানীতে এটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে বলে জানা গেলেও সিআইডি বলছে, তারা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। কারণ, ফেসবুকের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান মেটা তাদের এখনও কিছু জানায়নি। সিআইডি মেটার উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশে অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারীর ফোনে এ ধরনের নোটিফিকেশন দেখা যাচ্ছে।
উদ্যোগের পটভূমি
জানা গেছে, সিলেটের শিশু মুনতাহা হত্যাকাণ্ডের পর এক লাখেরও বেশি গণস্বাক্ষরের ভিত্তিতে শুরু হয় এই উদ্যোগ। তিন মাসের পাইলট প্রকল্প শেষে চালু হয় ‘মুন অ্যালার্ট’। মেটার কারিগরি সহায়তায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে জিরো মিসিং চিলড্রেন প্ল্যাটফর্ম ও সাইবার টিন্স।
মেটার ভূমিকা
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মেটার ট্রাস্ট এন্ড সেফটি বিভাগের পরিচালক অ্যামিলি ভেচার। তিনি ওই অনুষ্ঠানে বলেন, মেটা দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম বাংলাদেশের নিখোঁজ শিশু খোঁজার প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করল। বিশ্বে ৩৭ তম সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে আমরা কাজ করবো। যদি কোনো শিশু নিখোঁজ হয় আমরা তার ছবিসহ সর্বশেষ স্থান থেকে ১৬০ কিলোমিটারের মধ্যে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম ও মেসেঞ্জারে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেব, যেন কেউ শিশুকে দেখলেই পুলিশকে তথ্য দিতে পারে।
এরপর থেকেই মূলত মুন অ্যালার্ট ফিচারের মাধ্যমে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম ও মেসেঞ্জারে শিশু নিখোঁজের তাৎক্ষণিক বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
জিরো মিসিং চিলড্রেন প্ল্যাটফর্ম ও সাইবার টিন্স আশা করছে, মুন অ্যালার্ট চালুর ফলে নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। কোনো বাচ্চা যদি মিসিং হয় আমরা সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্টটা জারি করে দেওয়া সম্ভব হবে। তারা একা নয়, কমিউনিটির সাথে কাজ করার কথা জানিয়ে বলছে, তাদের সাথে ভলেন্টিয়ার হিসেবে পুলিশ, মানবাধিকার কমিশন—সবাই রয়েছে।
সিআইডির অবস্থান
তবে সিআইডি বলছে, তারা মুন অ্যালার্ট চালুর উদ্যোগ নিলেও মেটার কাছ থেকে এখনও কোনো অফিসিয়াল উত্তর পায়নি। এ কারণে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে মুন অ্যালার্টের কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না। এ বিষয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) মোহাম্মদ বদরুল আলম মোল্লা বলেন, নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান পেতে মুন অ্যালার্ট একটি ভালো উদ্যোগ। তবে এ বিষয়ে আমরা এখনও মেটার কাছ থেকে অফিসিয়াল বক্তব্য পাইনি। ফলে মুন অ্যালার্টটির কার্যক্রম আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করতে পারছি না। তবে আশা করছি মেটার পক্ষ থেকে দ্রুতই আমরা বক্তব্য পাবো। এরপর আমাদের কার্যক্রম শুরু হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান
উল্লেখ্য, গত ১৩ জানুয়ারি রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি সদর দফতরে সিআইডি ও ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশের’ যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তৎকালীন সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ। উদ্বোধনকালে তিনি বলেছিলেন, একটি পরিবারের ছোট্ট শিশু হারিয়ে গেলে স্বজনদের যে নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আমাদের প্রত্যয় হলো—আর একটি শিশুকেও যেন হারিয়ে যেতে না হয়। হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাদের ব্যাপারে নীরব থাকার দিন আমরা শেষ করতে চাই। অনেক সময় অভিভাবকরা বিভ্রান্তি এড়াতে বা নিজেরা খোঁজার চেষ্টা করতে গিয়ে থানায় রিপোর্ট করতে দেরি করেন। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার প্রথম কয়েক ঘণ্টা উদ্ধার প্রক্রিয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে দ্রুত তথ্য পাওয়া গেলে শিশুকে নিরাপদে উদ্ধারের সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
অ্যাম্বার অ্যালার্টের ধারণা
ওই অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে শিশু অ্যাম্বার হ্যাগারম্যান নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্বব্যাপী ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট’ ব্যবস্থার ধারণাটি জনপ্রিয়তা পায়। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশ এই পদ্ধতি অনুসরণ করছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে সিলেটে পাঁচ বছর বয়সী শিশু মুনতাহা আক্তার নিখোঁজ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি একটি সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কবার্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে। মুনতাহার নামানুসারেই এই প্রকল্পের নাম রাখা হয়েছে ‘মুন অ্যালার্ট’।
সিআইডির নেতৃত্বে এবং ‘জিরো মিসিং প্ল্যাটফর্ম’-এর কারিগরি সহায়তায় এই মুন অ্যালার্ট কাজ করবে। কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্মে তথ্য দিলে দ্রুততম সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন চেকপোস্ট এবং প্রযুক্তিনির্ভর নেটওয়ার্কে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে।



