নিজ কামারশালায় কাজ করছেন শ্রীবাস দাস (৬৭)। গতকাল রোববার দুপুরে মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার বড় সরুন্ডি গ্রামে দেখা যায়, পূর্ব দাশড়া-বকজুরী সড়কের পাশে টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট একটি কামারশালায় বসে কাজ করছেন তিনি। সামনে কয়লার চুল্লি, পাশে হাতুড়ি, সাঁড়াশি ও নানা সরঞ্জাম। আগুনে লোহা লাল করে সেটিকে পিটিয়ে প্রয়োজনীয় আকার দিচ্ছেন তিনি। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও পেশার প্রতি তাঁর ভালোবাসা কমেনি।
জীবনের ৪৫ বছর কামারের কাজে
শ্রীবাস দাসের বয়স এখন ৬৭ বছর। জীবনের প্রায় ৪৫ বছর তিনি কাটিয়েছেন আগুনের ভাট্টি, হাতুড়ি আর লোহা পেটানোর শব্দের মধ্যে। একসময় তাঁর তৈরি দা, কাস্তে ও কৃষিকাজের নানা সরঞ্জামের ব্যাপক চাহিদা ছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজের ব্যস্ততায় দম ফেলারও সময় মিলত না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই ব্যস্ততা এখন অনেকটাই স্মৃতি। কাজ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে, আর তাতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
শ্রীবাস দাস বলেন, তরুণ বয়সে তিনি মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকার দলিল মার্কেটের সামনে কামারের কাজ শুরু করেন। পরে বাসস্ট্যান্ডের পদ্মা পাম্পের পাশে এবং এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সামনে প্রায় ২০ বছর কাজ করেছেন। পাঁচ বছর আগে বয়স ও সুবিধার কথা বিবেচনা করে বাড়ির কাছেই বড় সরুন্ডি গ্রামে ছোট একটি কর্মশালা গড়ে তোলেন।
অতীতের স্মৃতি ও বর্তমান বাস্তবতা
অতীতের কথা স্মরণ করে শ্রীবাস দাস বলেন, ‘আগে ভাপি দিয়ে বাতাস চালিয়ে কয়লার আগুন জ্বালাতাম। তখন বিদ্যুতের সুবিধা ছিল না। দিনভর কাজ করেও অর্ডার শেষ করতে পারতাম না। কৃষকেরা দা, কাঁচি (কাস্তে), কোদাল বানানোর জন্য লাইন দিয়ে অপেক্ষা করত।’
নিজ হাতে তৈরি একটি দা বানাতে শ্রীবাসের বর্তমানে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ হয়। কাস্তে তৈরির মজুরি ৩০০ টাকা। দা শাণ বা ধার করতে নেন ১০০ টাকা, আর কাস্তে ধার করতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। তবে কাজের পরিমাণ আগের মতো নেই। ফলে আয়ও কমেছে।
শ্রীবাস দাস বলেন, ‘আগে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হতো। সংসারের জিনিসপত্রের দামও কম ছিল। তখন সংসার ভালোই চলত। এখন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বেশি আয় হয় না। আবার কোনো কোনো দিন বসে থাকতে হয়। মানুষ এখন বাজার থেকে তৈরি দা-কাঁচি কিনে নেয়। তাই কামারের কাছে আগের মতো আসে না। এখন আয় কমে গেছে। চাল, ডাল থেকে সব জিনিসপত্রের বাজারদর বাড়ছে; এখন খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।’
পরিবারের সংগ্রাম
কামারশালার কাছেই শ্রীবাস দাসের বাড়ি। স্ত্রী অঞ্জলী দাস দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর সংগ্রামের সঙ্গী। তিনি বলেন, ‘এই কাজ করেই আমাদের সংসার চলেছে। পোলাপানদের বড় করেছি। এখন পোলাপানের আলাদা সংসার, ওদেরই সংসার চলে না; আমাদের কীভাবে দেবে।’
শ্রীবাস ও অঞ্জলী দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে প্রকাশ দাস একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। ছোট ছেলে প্রবীর দাস টাইলসমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। একমাত্র মেয়ে অনিতা দাসের বিয়ে হয়েছে আট বছর আগে। ছেলেরা নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বাবাকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন।
কৃষকের চাহিদা এখনও আছে
পাশের বকজুরী গ্রামের কৃষক খোরশেদ আলী লোহার টুকরা নিয়ে শ্রীবাস দাসের কর্মশালায় এসেছেন কাস্তে তৈরি করতে। তিনি বলেন, ‘বাজারে কেনা কাঁচিতে লোহা ভালো না, ধার থাকে না। বানানো কাঁচির ধার অনেক দিন যায়।’
তবে কদর কমে গেলেও শ্রীবাস দাস আশা ছাড়েননি। প্রতিদিন সকালে কর্মশালার দরজা খুলে আগুন জ্বালান। কেউ দা ধার করাতে আসেন, কেউ কাস্তে বানাতে দেন। কাজ কম হলেও তিনি মনোযোগ দিয়ে করেন। কারণ, এই কাজই তাঁর পরিচয়, এই কাজই তাঁর জীবনের অবলম্বন।



