রাজশাহীর বানেশ্বর হাটে জমে উঠেছে আম বাজার। তবে দাম নিয়ে হতাশ চাষিরা। সুমিষ্ট ঘ্রাণ আর স্বাদের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এই হাটে ছুটে আসছেন। তবে ঈদের পর ক্রেতা সমাগম কিছুটা কম হওয়ায় আশানুরূপ দাম না পাওয়ার আক্ষেপ করছেন আম ব্যবসায়ী ও বাগান মালিকরা।
বানেশ্বর হাটে আমের বেচাকেনা
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর হাটে প্রায় অর্ধশত আড়ত রয়েছে। যেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে আমের জমজমাট বেচাকেনা। ক্রেতাদের তথ্যমতে, রবিবার (৭ জুন) বানেশ্বর হাটে গোপালভোগ প্রতি মণ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। আর ক্ষিরসাপাত/ হিমসাগর আম বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। তবে এই জাতের ভালো মানের আম বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়।
আর লখনা জাতের আম বিক্রি হয়েছে ৪০০ থেকে ৭০০ টাকায় (কেজি ১০ টাকার কিছু বেশি), রানি পছন্দ জাতের আম বিক্রি হয়েছে ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। আর গুটি জাতের আম ৪০০ থেকে ৭০০ টাকার (কেজি পড়ছে ১০ টাকা ও তার কিছু বেশি) মধ্যে কেনাবেচা হয়েছে। এ ছাড়া বানেশ্বর হাটে ভালো জাতের মধ্যে এসেছে ল্যাংড়া আম। এ দিন এই হাটে ল্যাংড়া আম বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে।
গত মৌসুমে এসব আমের দাম মণপ্রতি প্রায় এক হাজার টাকা বেশি ছিল। বাগান মালিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ১০ বছর ধরে তিনি আমের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার বাগানে ২২০টি আম গাছ রয়েছে। খরার কারণে গুটি ঝরে গেলেও নিয়মিত সেচ দেওয়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণ আম পেয়েছেন। তবে বাজারে গোপালভোগ ও ক্ষিরসাপাত আমের কিছুটা চাহিদা থাকলেও গুটি আমের চাহিদা একদমই নেই। তাই গুটি আম বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৪০০ থেকে ৭০০ টাকায়।
ব্যবসায়ীদের অভিমত
আরেক ব্যবসায়ী মন্টু বলেন, ঈদের ছুটির কারণে হাটে ক্রেতা ও বাইরের ব্যাপারীর সংখ্যা অনেক কম ছিল। তবে এখন বাড়ছে। আম বাগানের মালিক শহিদুল ইসলাম বলেন, আমের বাজার ভালো না। সারা বছর পরিচর্যা করে যে খরচ হয়েছে, তা ওঠানোই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি গাছে কীটনাশক ও সেচ বাবদ খরচ হয়েছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। দেড়শো গাছের বাগানটি তিন বছরের জন্য লিজ নিতে খরচ হয়েছে ৫ লাখ টাকা। গত দুই মৌসুমে যে আয় হয়েছে, তা বাগানের পেছনেই খরচ হয়ে গেছে। এবার কিছুটা আয়ের আশা করলেও দাম কম হওয়ায় খুব একটা লাভের মুখ দেখবেন না।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আমচাষি বাবু বলেন, তাঁর প্রায় ২০ বিঘা জমিতে আমবাগান রয়েছে। বর্তমানে গুটি আম ৪০০-৭০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচই এই দামে উঠছে না। গতবারের মতো এবারও লোকসান হচ্ছে।
ক্রেতা ও পাইকারদের মতামত
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর হাটে গোপালভোগ কিনতে আসা ব্যবসায়ী মিন্টু সরকার বলেন, গত বছরের এই সময়ে গোপালভোগের দাম ছিল প্রায় ২২০০ টাকা মণ। এবার দাম অনেক কম। অন্য আমের দামও বেশ কম। গেল বছর ঈদের পর দাম কমে গিয়েছিল। এবারও তাই হয়েছে। বানেশ্বর বাজারের আড়তদার মনিরুল ইসলাম মানিক বলেন, মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ট্রাক আম কিনে আড়তে রাখি। কিন্তু এবার বেচাকেনা অর্ধেকে নেমে এসেছে। চাহিদা কম থাকায় পাইকাররাও অর্ডার দিচ্ছেন কম, তাই আমের দামও কিছুটা কম।
তবে দাম সস্তা হওয়ায় খুশি হাটে আসা ক্রেতারা। হাটে আসা ক্রেতা প্রাঞ্জল ও কামরুল জানান, গত বছর আমের উৎপাদন কম হওয়ায় দাম বেশ চড়া ছিল। এ বছর দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকায় সাধারণ মানুষ আম কিনে খেতে পারছেন। পরিবারের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনদেরও আম উপহার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
আমের বাণিজ্য ও অর্থনীতি
হাট ইজারাদার জাকির হোসেন রাসেল জানান, মৌসুম শুরু হওয়ায় প্রতিদিন এই হাটে গড়ে অর্ধকোটি টাকার আম কেনাবেচা হচ্ছে। দুর্গাপুর উপজেলার পালি গ্রামের আমচাষি রাজু মিয়া জানান, বর্তমান দামে আম বিক্রি করে শ্রমিক, পরিবহন ও বাগান পরিচর্যার খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আক্ষেপ করে জানান, এবার ঈদের ছুটিতে গোপালের কপাল খারাপ। এই দামে আম বিক্রি করা মানে লোকসান গোনা।
আমকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান গড়ে উঠেছে। এদের কেউ আম নামানোর কাজে, কেউ ক্যারেট বা ঝুড়ি সাজানোয়, আবার কেউ কুরিয়ার সার্ভিসে আম পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছেন। এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক চাকা সচল হয় আমের বাণিজ্যকে কেন্দ্র করেই। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এসব আম চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
সরকারি ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক পাপিয়া রহমান মৌরী বলেন, প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কঠোর নজরদারির কারণে শতভাগ নিরাপদ ও রাসায়নিকমুক্ত আম বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে। রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহ-সভাপতি শামসুর রহমান শান্তন বলেন, আমের পাল্প থেকে আচার, জুস, আমসত্ব বা চকলেট তৈরির কারখানা গড়ে উঠলে আমের ন্যায্যমূল্য পেতেন বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া আম কিছুদিন সংরক্ষণ করে বাজারে বিক্রি করতে পারলেও ভালো দাম পাওয়া যেত। ভবিষ্যতে আমভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে এবং আম রফতানি প্রক্রিয়া সহজ করা হলে আম চাষিরা বেশি লাভবান হবেন।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানালেন, এ বছর আমের উৎপাদন ভালো হয়েছে। বাজারে সরবরাহও বেশি। ফলে দামের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে মৌসুম যত এগোবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, বাজার পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে আমরা আশা করছি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো ফলন কৃষকের জন্য যেমন সুখবর, তেমনি বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ চেইন ঠিকভাবে পরিচালিত না হলে সেই সুফল অনেক সময় কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। তাই উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ, বিপণন ও দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও এখন সময়ের দাবি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহীর ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমির আমবাগান থেকে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ টন আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। অনুকূল আবহাওয়া এবং বড় ধরনের কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় এ বছর অধিকাংশ মুকুল টিকে গেছে। ফলে ফলনও হয়েছে সন্তোষজনক।



