গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, বাজেটে সমাধানের আশা
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত

সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলস, একটি রপ্তানিমুখী সুতা উৎপাদন কারখানা, গ্যাস সংকটে গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন। কারখানাটির জন্য অনুমোদিত গ্যাসচাপ ১০ পিএসআই হলেও তারা মাত্র দেড় থেকে দুই পিএসআই পাচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় কারখানা কর্তৃপক্ষ সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের জন্য ১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ৬০ শতাংশে ব্যবহৃত হচ্ছে।

লিটল স্টারের ক্ষতি ও শিল্পের চিত্র

লিটল স্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম জানান, শুধু গ্যাস সংকটের কারণে গত চার বছরে তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় আড়াই শ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। দেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানাই দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন ও রূপান্তরের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে কিছু স্থিতিশীলতা এলেও শুরু হয় ইরান যুদ্ধ, যা জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয়।

মূল্যস্ফীতি ও ব্যবসায় মন্দা

দেশ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পণ্যের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব বিরাজ করছে। নতুন বিনিয়োগ কম, চলছে ব্যয় সাশ্রয় ও কর্মী ছাঁটাই। নতুন নিয়োগের সংখ্যা প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাজেট ২০২৬-২৭: চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

এই প্রেক্ষাপটে ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করবেন, যা নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবসায় গতি ফেরানো, বিনিয়োগ চাঙা করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোই সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান মানোয়ার হোসেন বলেন, সরকারের প্রথমেই উপলব্ধি করা দরকার যে দেশের অর্থনীতি এখনো সংকটাপন্ন। এই অর্থনীতি সুস্থ হতে সময় লাগবে। নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের আগে বর্তমানে সংকটে থাকা বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিনিয়োগের বর্তমান অবস্থা

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বিনিয়োগকে জিডিপির অনুপাতে দেখা হয়। তিন বছর ধরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের হার ছিল ২৪.৫২ শতাংশ, যা পরের দুই অর্থবছরে কমে যথাক্রমে ২৪.১৮ ও ২৩.৯৬ শতাংশ হয়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হার ২২.৪৮ শতাংশে নেমে আসে, যা ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। এলসি নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ, যা নতুন বিনিয়োগ বা সম্প্রসারণ হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়।

উচ্চ সুদের হার ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়া রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। গত এপ্রিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ, যা সাধারণত ১০ শতাংশের ওপরে থাকে।

এনপলি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসা অর্ধেক কমে গিয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ব্যবসা এখনো ১৮-২০ শতাংশ কম। দীর্ঘদিন ব্যবসা কম থাকায় প্রতিষ্ঠানে চলতি মূলধনে টান পড়েছে।

সরকারের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্র জানায়, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি ব্যবসার খরচ কমাতে বাজেটে বেশ কিছু উদ্যোগ থাকবে। অন্তত ১৯ ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও স্থানীয় পর্যায়ে উৎসে করের হার কমানো হতে পারে। তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হতে পারে। এছাড়া ব্যবসায় লাইসেন্স ও অনুমোদন স্বল্প সময়ে পাওয়ার ব্যবস্থা করতে একগুচ্ছ ঘোষণা থাকতে পারে।

বাজেটের আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ শিল্পকারখানার জন্য। এই তহবিল থেকে গড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে বেসরকারি খাত।

বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ১৮০ দিনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ২৫টি অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য হলো বিনিয়োগ সেবা সহজ করতে বিডা, বেজা, বেপজা, পিপিপিএ ও হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষকে একীভূত করা এবং চীনে বিডার অফিস চালু করা।

বিদেশি বিনিয়োগের চিত্র

বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘদিন ধরে এফডিআইয়ে গতি নেই। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১০০ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের ১৩১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের তুলনায় সাড়ে ২৩ শতাংশ কম।

উদ্যোক্তারা বলেন, দেশি ব্যবসায়ীরা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদহারসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। দেশি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা মসৃণ হলে বিদেশিরা বিনিয়োগে উৎসাহী হন।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ১৮০ দিনের পরিকল্পনা বিনিয়োগের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।

কর্মসংস্থান পরিস্থিতি

ঈদের পর সাভারে আল-মুসলিম গ্রুপের ৭ পোশাক কারখানায় ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ছয়টি শিল্পাঞ্চলে কয়েক হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসায় গতি কম থাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কম। ২০২৪ সালের শেষে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ, যা আগের বছরের ২৫.৫ লাখ থেকে বেড়েছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, যেকোনো উপায়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। তা না হলে চাহিদা কমে যাবে, টাকার অবমূল্যায়ন বাড়বে, আমদানি ব্যয় ও ব্যবসার খরচ বাড়বে। জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং নতুন কূপ খননের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফেরাতে হবে। ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করার কাজ শুরু করতে হবে এবং যেসব সমস্যা বেশি ভোগাচ্ছে সেগুলো আগে সমাধান করতে হবে।