দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয়ের প্রায় সমপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি খাত হচ্ছে ক্ষুদ্রঋণ। যদিও প্রবৃদ্ধির আলোচনায় প্রথম দুটি খাত যেভাবে গুরুত্ব পায়, ক্ষুদ্রঋণ খাত সেভাবে আলোচনায় আসেনি। কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এখন ক্ষুদ্রঋণ খাতকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে।
আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান এ কথা বলেন।
‘ক্ষুদ্রঋণ খাতের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা: বাজেট ২০২৬-২৭ পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক এ বৈঠক যৌথভাবে আয়োজন করে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর জোট ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ) ও প্রথম আলো।
গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন হোসেন জিল্লুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউসেপ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল করিম।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্ষুদ্রঋণ ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দেন সিডিএফের চেয়ারম্যান মুর্শেদ আলম সরকার, পিএম কের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এনামুল হক, উন্নয়ন খাত–বিশেষজ্ঞ দেওয়ান এ এইচ আলমগীর, এসকেএস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রাসেল আহমেদ, পিদিম ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক বরুন ব্যানার্জি, দিশার প্রধান নির্বাহী সহিদ উল্লাহ, সিডিএফের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আকতার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।
গোলটেবিল আলোচনায় পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম অংশীদার হচ্ছে ক্ষুদ্রঋণ খাত। চার কোটি গ্রাহকের এই খাতে তিন লাখ কোটি টাকা ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ হয়েছে। এটি প্রায় ১৬ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমান। এই সংখ্যা বিশাল। মূল্য সংযোজন বাদ দিলে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের আকার ২০ বিলিয়ন ডলারের কিছুটা বেশি। আর প্রবাসী আয়ের পরিমাণও কাছাকাছি। সে হিসাবে ক্ষুদ্রঋণ খাত তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয়ের প্রায় সমপর্যায়ের একটি খাত। অর্থনৈতিক রূপান্তর, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়নের বিবেচনায় ক্ষুদ্রঋণ খাতকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হিসেবে নিতে হবে।
ক্ষুদ্রঋণ খাতের প্রচার ও ব্র্যান্ডিংয়ের ঘাটতির কথা তুলে ধরে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, পুরো খাতটি বর্তমানে একটি ব্র্যান্ডিং সংকটে ভুগছে। এ সময় তিনি ‘এনজিও’ শব্দের পরিবর্তে ‘এমএফআই’ (মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন) বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান শব্দটিকে সামনে আনার তাগিদ দেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে একধরনের অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণ বা টার্নিং পয়েন্টে রয়েছে উল্লেখ করে হোসেন জিল্লুর রহমান জানান, করোনা মহামারি ও ধারাবাহিক বৈশ্বিক সংকটের ধাক্কায় শুধু জাতীয় অর্থনীতিই নয়, ক্ষুদ্রঋণ অর্থনীতিও একটি কঠিন সময় পার করছে।
এ সময় ক্ষুদ্রঋণ খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আমাদের নতুন সরকার এসেছে। তারা লক্ষ কোটি (ট্রিলিয়ন) ডলারের অর্থনীতির কথা বলছে। কিন্তু যারা পরিবর্তন আনতে পারে, মাঠপর্যায়ের সেই প্রকৃত অংশীজনদের আমরা যদি ক্ষমতায়িত না করতে পারি, তাহলে লক্ষ কোটি ডলারের স্বপ্ন কাগজেই থেকে যাবে। নীতিগত সহায়তা, আর্থিক সহযোগিতা ও কৌশলগত স্বীকৃতির মাধ্যমে এই অংশীজনদের সামনে নিয়ে আসতে হবে।’
‘টুকটাক অর্থনীতি থেকে নতুন গ্রামীণ অর্থনীতি’
গ্রামীণ অর্থনীতির আমূল পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে হোসেন জিল্লুর রহমান একে ‘নিউ রুরাল’ বা ‘নতুন গ্রামীণ অর্থনীতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, নতুন গ্রামীণ অর্থনীতির ধারণায় একাধারে গ্রাম, ছোট শহর, উন্নত যোগাযোগ, মূল্য সংযোজন ও বৈশ্বিক বাজার সংযোগ—সব যুক্ত হয়েছে।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সত্তরের দশকে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম মুড়ি বিক্রির মতো ‘টুকটাক অর্থনীতি’র মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন তা বড় ব্যবসা ও গতিশীল কৃষিতে রূপ নিয়েছে। দেশের ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষের কাছে ব্যাংকের মতো আনুষ্ঠানিক খাত পুরোপুরি পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো এই কাজ সহজে করতে পারে। এটি ক্ষুদ্রঋণ খাতের মূল প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি। সরকারের উচিত হবে গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের জন্য তাদের বিভিন্ন উদ্যোগে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে জোরালোভাবে সম্পৃক্ত করা।
বাজেট নিয়ে প্রস্তাব
গোলটেবিল বৈঠক থেকে হোসেন জিল্লুর রহমান আসন্ন বাজেট ও নীতিগত পরিবর্তনের জন্য কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন। বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার যে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল ঘোষণা করেছে, তা সরাসরি এমএফআইয়ের মাধ্যমে বিতরণের প্রস্তাব দেন তিনি।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কৃষকদের সঙ্গে ব্যাংকের সার্বিক যোগাযোগ নেই। এই অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক শেষ পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগী (মিডেলম্যান) হবে। তাই কাজটি সরাসরি এমএফআইকে দিলে ভালো হবে।
এর পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল কৃষির জন্য ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থায়নের খাত তৈরির পরামর্শ দেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান। অন্যান্য পরামর্শের মধ্যে রয়েছে—এমএফআইগুলো ব্যাংকে যে টাকা (এফডিআর) জমা রাখে, তার বিপরীতে কাটা উৎস করের ফেরতপদ্ধতিকে সহজ করা। জলবায়ুঝুঁকি মোকাবিলায় ক্রপ ইনস্যুরেন্স বা শস্য বিমার প্রসারে কৃষকদের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য মওকুফ করা। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমানোর জন্য তাদের সঞ্চয় সংগ্রহের নিয়মকানুন আরও সহজ করা। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (এমআরএ) সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এ খাত প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।



