ভারতীয় বিজ্ঞানী নন্দিনী হরিনাথের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটিতে পরা উজ্জ্বল লাল ও নীল রঙের সিল্কের শাড়ি এখন যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস জাদুঘরে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে সংরক্ষিত আছে। তিনি ভারতের প্রথম মঙ্গল অভিযান মঙ্গলযানের কার্যক্রম পরিচালনাবিষয়ক পরিচালক ছিলেন।
মঙ্গলযানের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে শাড়ি
২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর, যখন মহাকাশযানটি পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে মঙ্গলের দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন নন্দিনী সেই শাড়ি পরেছিলেন। তিনি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময়গুলোতে বা ভারতের মহাকাশ সংস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করার সময় শাড়ি পরতে পছন্দ করেন, বিশেষ করে তাঁর বাবার দেওয়া শাড়ি। তাই ওই দিনও তিনি পোশাক হিসেবে শাড়িকেই বেছে নিয়েছিলেন, কারণ এটি ছিল প্রকল্পের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ মুহূর্ত।
নন্দিনী বলেন, ‘এটি ছিল একটি শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্ত, অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, মহাকাশযান কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে এবং কখন যাবে। সেই দিনের কাজের ওপরই অভিযানের সাফল্য নির্ভর করছিল।’ ২০১৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মহাকাশযানটি সফলভাবে মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছায়, এবং বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে এই সাফল্য অর্জন করে ভারত।
ভাইরাল ছবি ও নারী বিজ্ঞানীদের ভূমিকা
সেদিন তোলা একটি ছবিতে শাড়ি পরা কয়েকজন নারীকে ইসরোতে মঙ্গলযানের সাফল্য উদযাপন করতে দেখা যায়, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। ছবিটি ভারতের মহাকাশ গবেষণাকে শুধুই পুরুষদের ক্ষেত্র হিসেবে দেখার গৎবাঁধা ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। ইসরো পরে ব্যাখ্যা দেয় যে, ভাইরাল হওয়া ছবির নারীরা মূলত প্রশাসনিক বিভাগের কর্মী ছিলেন, তবে অভিযান পরিচালনায় অনেক নারী বিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং সাফল্যের মুহূর্তে তাঁরা নিয়ন্ত্রণকক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
কিউরেটরের উদ্যোগে শাড়ি জাদুঘরে
যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান জাদুঘরের মহাকাশ ইতিহাসবিষয়ক কিউরেটর ম্যাট শিন্ডেল ২০২০ সালে ই-মেইলের মাধ্যমে নন্দিনী হরিনাথের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি ছবিটি দেখে মুগ্ধ হন এবং মনে করেন, এই গল্পটি সবার জানা উচিত। শিন্ডেল বলেন, ‘আমি মনে করেছি, এই দারুণ গল্পটা সবার জানা উচিত। এটা সেই রকেট নারীদের গল্প, যাঁরা এই গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ অভিযানের একেবারে সামনের সারিতে ও কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।’
দুজনে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন যে, মঙ্গলযান পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে মঙ্গলের পথে রওনা হওয়ার দিনে নন্দিনী যে শাড়ি পরেছিলেন, সেটিই জাদুঘরে রাখা হবে। অবশেষে শাড়ি ও এর সঙ্গে থাকা নীল ব্লাউজটি জাদুঘরে পাঠানো হয়। জাদুঘরের টেক্সটাইল সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ বেথ নাইট ইউটিউব ভিডিও দেখে শাড়ি পরানো রপ্ত করেন।
প্রদর্শনীতে শাড়ির স্থান
শাড়িটি এখন জাদুঘরের ‘ফিউচারস ইন স্পেস’ গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে, যেখানে খেলনা, গেমস, চলচ্চিত্রের পোস্টারসহ নানা ধরনের বস্তু রাখা আছে। মহাকাশে যাওয়া প্রথম মার্কিন নারী স্যালি রাইডের পরা আইকনিক নীল টি-শার্টের পাশে এটিকে রাখা হয়েছে। শিন্ডেল বলেন, এই প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য হলো দর্শনার্থীদের সাম্প্রতিক মহাকাশ অভিযানের সঙ্গে যুক্ত করা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করা।
শিন্ডেলের মতে, নন্দিনীর শাড়িটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণার প্রতীক। প্রথমত, এটি ভারতের প্রথম মঙ্গল অভিযান এবং দেশের সফল মহাকাশ কর্মসূচির প্রতি জাতীয় গর্বের প্রতীক। দ্বিতীয়ত, এটি তাঁর ব্যক্তিগত গল্পকে তুলে ধরে, যা আরও অনেক নারীকে বিজ্ঞানক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়তে উৎসাহিত করতে পারে।
সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ও দর্শক প্রতিক্রিয়া
শিন্ডেল শাড়িটি বেছে নেওয়ার আরেকটি কারণ হিসেবে এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এবং সহজে চেনা যাওয়ার মতো দৃশ্যমান পরিচিতির কথা উল্লেখ করেন। দর্শনার্থীরা প্রদর্শনীতে রাখা বস্তুগুলো সম্পর্কে আরও জানতে টাচস্ক্রিন ব্যবহার করতে পারেন। শিন্ডেল বলেন, ‘দর্শনার্থীরা শাড়িটি দেখে এর সম্পর্কে আরও জানতে চাইছেন। এটা দেখে আমি খুবই আনন্দিত। এটি আমাদের সংগ্রহগুলোর মধ্যে এক অসাধারণ সংযোজন।’
জাদুঘরের সংগ্রহে ভারতের আরও কিছু বস্তু আছে, যেমন ভারতের বিমানবাহিনী ও উড়োজাহাজ সংস্থার বিভিন্ন সামগ্রী এবং লেখক আর্থার সি ক্লার্ককে ইসরোর দেওয়া একটি স্মারক রুপার ট্রে। তবে নন্দিনীর শাড়িটি প্রথম জিনিস, যা ভারতের আন্তগ্রহীয় বিজ্ঞান সংগ্রহ থেকে নেওয়া হয়েছে এবং এটি ওই জাদুঘরে প্রদর্শিত প্রথম শাড়ি।



